সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩

সাবেক মার্কিন ফেড প্রধান অ্যালান গ্রিনস্প্যান আর নেই

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ২২, ২০২৬, ০৯:২০ পিএম

সাবেক মার্কিন ফেড প্রধান অ্যালান গ্রিনস্প্যান আর নেই

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক প্রধান অ্যালান গ্রিনস্প্যান সোমবার ওয়াশিংটনে শত বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত ও পার্কিনসন্স রোগের জটিলতায় মারা গেছেন বলে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘ আঠারো বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়া গ্রিনস্প্যানকে আমেরিকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন তার ২৯ বছর বয়সী বৈবাহিক জীবনের সঙ্গী এবং এনবিসি নিউজের বিখ্যাত সাংবাদিক আন্দ্রেয়া মিচেল। মিচেল এক আবেগঘন বিবৃতিতে জানান যে গ্রিনস্প্যান কেবল একজন দূরদর্শী অর্থনীতিবিদই ছিলেন না, বরং ব্যক্তিগত জীবনে বেসবল, টেনিস, গলফ এবং জ্যাজ সংগীতের প্রতি তার এক ধরনের গভীর অনুরাগী ভালোবাসা ছিল।

১৯৮৭ সালে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান প্রথম গ্রিনস্প্যানকে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই মাসের মাথায় তিনি এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হন, যখন মার্কিন শেয়ার বাজারে ইতিহাসে একক দিনে সবচেয়ে বড় ধস নামে এবং ডাউন জোন্স সূচক ২২ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। সেই ঐতিহাসিক সংকটের সময় তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ওয়াল স্ট্রিটকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে আর্থিক ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করতে ফেডারেল রিজার্ভ প্রয়োজনীয় সব ধরনের অর্থ সরবরাহ করবে। তার এই সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে বাজার দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং মার্কিন অর্থনীতি এক বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায়।

অ্যালান গ্রিনস্প্যান তার দীর্ঘ মেয়াদে মোট চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের অধীনে পাঁচ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে তিনজন রিপাবলিকান এবং একজন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার সময়কালে ১৯৯১ সালের মার্চ মাস থেকে শুরু করে টানা দশ বছর ধরে মার্কিন অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির যুগ দেখা যায়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তার অসাধারণ দূরদর্শিতার কারণে গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকরা তাকে প্রায়শই ওরেকল বা মায়েস্ট্রো নামে অভিহিত করতেন। ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে যখন তিনি দীর্ঘ সাড়ে আঠারো বছর পর পদত্যাগ করেন, তখন তিনি মার্কিন ইতিহাসের দ্বিতীয় দীর্ঘতম মেয়াদ সম্পন্নকারী ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছিলেন।

যা কম স্পষ্ট তা হলো বিশ্ব অর্থনীতিতে তার নীতিগুলোর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাবকে history কীভাবে মূল্যায়ন করবে। তিনি পদত্যাগ করার মাত্র দুই বছর পর ২০০৮ সালে মার্কিন আবাসন বাজারে এক ভয়াবহ ধস নামে, যা পরবর্তীতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার রূপ নেয়। সমালোচকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ যে গ্রিনস্প্যানের দীর্ঘমেয়াদী কম সুদের হার এবং অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থা ব্যাংকিং খাতকে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিতে প্ররোচিত করেছিল। পরবর্তীতে ২০১১ সালের একটি তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনেও বলা হয় যে গ্রিনস্প্যানের অনিয়ন্ত্রণ নীতি আর্থিক খাতের সুরক্ষাকবচগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছিল। তিনি নিজেও পরবর্তীকালে স্বীকার করেছিলেন যে ব্যাংকগুলো নিজেদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে বলে বিশ্বাস করাটা তার একটি বড় ভুল ছিল।

অবসর গ্রহণের পরও গ্রিনস্প্যান শেষ বয়স পর্যন্ত অর্থনৈতিক নানা বিষয়ে নিজের সক্রিয় মতামত প্রকাশ করে গেছেন। এমনকি চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসেও তিনি ফেডারেল রিজার্ভের রাজনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষার পক্ষে একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, যেখানে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থাসের ইতিহাসে তার অবদান এবং একই সাথে তার নীতি নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘকাল ধরে অর্থনীতিবিদদের মাঝে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। ফেডারেল রিজার্ভ সোমবার এক শোকবার্তায় জানিয়েছে যে চেয়ারম্যান গ্রিনস্প্যানের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার এবং তার তৈরি করা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আগামী দিনেও বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।

banner
Link copied!