ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তীব্র দাবদাহের কারণে গত বৃহস্পতিবার থেকে ফ্রান্সে পানিতে ডুবে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান লেকোর্নু নিশ্চিত করেছেন, বিবিসি নিউজ এবং বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে। অতিরিক্ত গরম থেকে বাঁচতে মানুষ নদী এবং অন্যান্য অনিরাপদ জলাশয়ে নামার পর এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী একটি জরুরি সংকটকালীন বৈঠকে এই তথ্য জানিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে উল্লেখ করেছেন এবং মন্ত্রীদের সমস্ত সফর বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছেন।
দেশটির ক্রীড়া ও যুব বিষয়ক মন্ত্রী মারিনা ফেরারি ফরাসি রেডিওতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তীব্র গরমের সময় নজরদারিবিহীন এলাকায় সাঁতার কাটার ঝুঁকি নিয়ে জনগণকে সতর্ক করেছেন। তিনি জানান যে বহু মানুষ কোনো ধরনের সতর্কতা অবলম্বন না করেই নদী এবং বিভিন্ন ক্যানেলে ভিড় করছেন যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ফ্রান্সের পাশাপাশি স্পেন, যুক্তরাজ্য এবং ইতালিও এই প্রারম্ভিক গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে।
ফ্রান্সের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা মেতেও ফ্রান্স জানিয়েছে যে দেশটিতে ইতিহাসের সবচেয়ে গরম জুন মাস পার হচ্ছে এবং গত সোমবার রাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ২১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে যা ২০১৯ সালের রেকর্ডকে ভেঙে দিয়েছে। তীব্র এই পরিস্থিতির কারণে দেশের অর্ধেকেরও বেশি অর্থাৎ ৫৪টি বিভাগ বা অঞ্চলে সর্বোচ্চ লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে যা প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মানুষকে প্রভাবিত করছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে দেশের ১ হাজার ৩৫০টিরও বেশি স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গলফেচ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি চুল্লি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কারণ গারোন নদীর পানির তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছে। প্যারিসের বিখ্যাত আইফেল টাওয়ারও তীব্র গরমের কারণে বিকেলে তাদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অন্যেদিকে স্পেনের আবহাওয়া সংস্থা এইমেত জানিয়েছে যে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় কর্দোবা শহরের গ্রামীণ এলাকায় তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইব্রো উপত্যকায় ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং ইতিমধ্যে আন্দুজার এলাকায় ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্পেনে জুনের এই দাবদাহ এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে পূর্ববর্তী ২৫ বছরে মাত্র দুটি দাবদাহ দেখা গিয়েছিল। ইতালির রোম, মিলান, ফ্লোরেন্স, তুরিন এবং ভেনিসসহ ১৫টি প্রধান শহরে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে যা সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মিলান ও তুরিনে সাময়িক বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটেছে। স্পেনের পাইকারি বাজারে বিদ্যুতের দাম প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় ১১০ ইউরো ছাড়িয়ে গেছে যা গত মার্চ মাসের পর সর্বোচ্চ।
ফ্রান্সের এই তীব্র গরমে বিভিন্ন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে যার মধ্যে ফন্টেইন-লা পোর্ট এলাকায় সিন নদীতে পরিবারের সাথে গোসল করতে গিয়ে সাঁতার না জানা এক ১৩ বছরের কিশোরী প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ অঞ্চলের কার্পেনত্রাস শহরের একটি আবাসিক পার্কিং লটে রোদের মধ্যে পার্ক করা গাড়ির ভেতর আটকে থেকে দুই এবং চার বছর বয়সী দুটি শিশু তীব্র গরমের কারণে মারা গেছে বলে স্থানীয় প্রসিকিউটর নিশ্চিত করেছেন। জার্মানির পশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে এবং সেখানেও রাইন নদীসহ বিভিন্ন হ্রদে সাঁতার কাটতে গিয়ে সপ্তাহান্তে অন্তত ৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে জার্মান লাইফসেভিং অ্যাসোসিয়েশন। যুক্তরাজ্যেও জুন মাসের সর্বকালের তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেক স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং ট্রেন চলাচল সীমিত করা হয়েছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো এই নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ কতদিন স্থায়ী হবে এবং এর ফলে ইউরোপের বিদ্যুৎ গ্রিড ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদী কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
