সোমবার, ০৩ আগস্ট, ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

নাৎসিদের গোপন ভি-টু রকেট পোল্যান্ড থেকে পাচারের অবিশ্বাস্য গল্প

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ৩, ২০২৬, ০৭:০৭ পিএম

নাৎসিদের গোপন ভি-টু রকেট পোল্যান্ড থেকে পাচারের অবিশ্বাস্য গল্প

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানির তৈরি ভি-টু রকেটের গোপন প্রযুক্তি পোল্যান্ড থেকে ব্রিটেনে পাচার করার একটি দুঃসাহসিক অভিযানের কথা সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজ তুলে ধরেছে। ১৯৪৪ সালের ৬ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল ফৌজ পোল্যান্ডের ব্লিজনা গ্রামে পৌঁছায় এবং এলাকাটি নাৎসি দখলমুক্ত করে। বিবিসি নিউজের তথ্যমতে, কৃষিজমি এবং ঘন পাইন বনে ঘেরা এই আপাত শান্ত গ্রামটি ছিল অ্যাডলফ হিটলারের একটি অত্যন্ত গোপন সামরিক পরীক্ষা কেন্দ্র। এখান থেকেই ভি-টু রকেটের পরীক্ষা চালানো হতো, যাকে জার্মানরা তাদের প্রতিশোধের অস্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল।

প্রকৌশলী ভের্নহার ফন ব্রাউনের নকশা করা এই রকেট ছিল বিশ্বের প্রথম আধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এর পাল্লা ছিল প্রায় ১৭০ মাইল এবং এটি ১ টন ওজনের বিস্ফোরক বহন করতে পারত। সুপারসনিক গতি এবং অনেক উঁচু দিয়ে ওড়ার ক্ষমতার কারণে এটি শত্রুপক্ষকে কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই আঘাত হানতে সক্ষম ছিল। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা ১৯৪৩ সালের আগে এই ভয়ংকর রকেটের অস্তিত্ব সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানতেন না। বিবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেনমার্কের একজন রাসায়নিক প্রকৌশলী ১৯৪২ সালের ডিসেম্বর মাসে বার্লিনে দুজন জার্মান প্রকৌশলীর কথোপকথন থেকে প্রথমবারের মতো এই নতুন অস্ত্রের খবর পান। তারা বাল্টিক উপকূলে একটি নতুন অস্ত্র পরীক্ষার কথা বলছিলেন।

পরবর্তীতে ১৯৪৩ সালে ব্রিটেনে বন্দি দুজন জার্মান জেনারেলের গোপন আলাপচারিতা আড়ি পেতে শোনার পর ব্রিটিশ গোয়েন্দারা বিষয়টি পুরোপুরি বিশ্বাস করেন। বন্দি জেনারেলরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলেন কেন এখনও দূরপাল্লার রকেটগুলো লন্ডনে হামলা করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে না। তারা ভেবেছিলেন হয়তো কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে, কারণ তাদের জানানো হয়েছিল যে অস্ত্রগুলো কয়েক মাসের মধ্যেই প্রস্তুত হয়ে যাবে। গোয়েন্দা বিজ্ঞানী আর ভি জোন্স এবং বিশ্লেষক চার্লস ফ্রাঙ্ক তখন নিশ্চিত হন যে জার্মানরা সত্যিই কোনো আধুনিক দূরপাল্লার রকেট তৈরি করছে এবং এটি নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ব্রিটিশ বাহিনী ১৯৪৩ সালের আগস্ট মাসে বাল্টিক উপকূলের পিনেমুন্ডে অবস্থিত নাৎসিদের গোপন গবেষণা কেন্দ্রে প্রবল বোমা হামলা চালায়। এরপরই জার্মান সামরিক বাহিনী তাদের ভি-টু রকেটের পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি পোল্যান্ডের ব্লিজনা নামক স্থানে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। বনভূমি ঘেরা এই এলাকাটি কৌশলগতভাবে এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে স্বয়ং হিটলার এবং হাইনরিখ হিমলার সেখানে পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। তবে শুরুর দিকের রকেটগুলোতে একটি বড় কারিগরি ত্রুটি ছিল, যার কারণে প্রায়ই এগুলো উৎক্ষেপণের পর মাঝপথেই ধ্বংস হয়ে যেত এবং পূর্ব পোল্যান্ডের বুগ নদীর কাছাকাছি এলাকায় ভেঙে পড়ত। জার্মান সৈন্যরা এসব ধ্বংসাবশেষ সংগ্রহ করার জন্য সেখানে মোতায়েন ছিল।

তবে স্থানীয় পোলিশ সাধারণ মানুষ এবং প্রতিরোধ যোদ্ধারা জার্মানদের আগেই এই রকেটের ধ্বংসাবশেষ নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যান। বিবিসি নিউজের তথ্যমতে, ১৯৪৪ সালের মে মাসে একটি ভি-টু রকেট বুগ নদীর কর্দমাক্ত তীরে প্রায় অক্ষত অবস্থায় আছড়ে পড়ে। স্থানীয় গ্রামবাসীরা দ্রুত রকেটটিকে নলখাগড়া দিয়ে ঢেকে ফেলেন এবং পোলিশ প্রতিরোধ বাহিনীর নেতা লেফটেন্যান্ট তাদেউশ জাকবস্কিকে খবর দেন। জার্মান বাহিনী বেশ কিছুদিন খোঁজাখুঁজি করে রকেটটির সন্ধান না পেয়ে হাল ছেড়ে দেয়। এরপর পোলিশ বিশেষজ্ঞরা নদী থেকে রকেটটি উদ্ধার করে এর বিভিন্ন অংশ খুলে ফেলেন এবং অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে সেই অংশগুলো ব্রিটেনে পাচার করেন। এই অভিযানটি মিত্রবাহিনীকে রকেটের কারিগরি দুর্বলতা বুঝতে সহায়তা করেছিল এবং ব্রিটিশ বাহিনীকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য হামলার জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করেছিল।

banner
Link copied!