পরিত্যক্ত প্রাচীন সভ্যতার রহস্য উদ্ঘাটনে ১৯১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক অধ্যাপক পেরুর আন্দিজ পর্বতমালায় ইনকাদের শেষ রাজধানী আবিষ্কারের দাবি করেছিলেন। হাইরাম বিংহাম নামক সেই শিক্ষাবিদ তখন দাবি করেন যে বিখ্যাত মাচু পিচ্চু ধ্বংসাবশেষই হলো সেই হারানো রাজধানী। তবে সেই দাবি যে পুরোপুরি সঠিক ছিল না, তা প্রমাণ করতে অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় লেগেছিল। পরবর্তী সময়ে জিন স্যাভয় নামের আরেক মার্কিন অভিযাত্রী প্রমাণ করেন যে মাচু পিচ্চু নয়, বরং অন্য এক স্থানে রয়েছে ইনকাদের আসল রাজকীয় দুর্গ। ব্রিটিশ সম্প্রচার মাধ্যম বিবিসি নিউজ এবং দ্য গার্ডিয়ান প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী এই ঐতিহাসিক সত্য উন্মোচিত হয়।
১৯৬৪ সালের আগস্ট মাসে জিন স্যাভয় পেরুর দুর্গম আমাজন অববাহিকার মেঘাচ্ছন্ন অরণ্যে এস্পিরিতু পাম্পা নামক একটি প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পান। স্থানীয় আদিবাসীদের ভাষায় যার অর্থ হলো আত্মাদের সমভূমি বা ভিলকাবাম্বা। মাচু পিচ্চু থেকে প্রায় ষাট কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই রহস্যময় স্থানটি ইনকাদের শেষ রাজা ম্যানকোর ঐতিহাসিক রাজধানী বলে চিহ্নিত করেন তিনি। স্প্যানিশ আগ্রাসনের মুখে রাজধানী কুসকো থেকে বিতাড়িত হয়ে রাজা ম্যানকো ও তাঁর অনুসারীরা দুর্গম পাহাড়ের এই অঞ্চলে নতুন দুর্গ ও প্রাসাদ গড়ে তুলেছিলেন। দীর্ঘ শতাব্দী ধরে জঙ্গল ও প্রকৃতির আড়ালে ঢাকা থাকা এই নগরীর অবস্থান নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষকদের মনে গভীর কৌতূহল ছিল।
অভিযাত্রী জিন স্যাভয়ের এই চাঞ্চল্যকর আবিষ্কারের মাত্র ছয় সপ্তাহ পর বিবিসির একটি টেলিভিশন দল অত্যন্ত দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে সেই স্থানে পৌঁছায়। নদী পারাপারের সময় তীব্র স্রোত ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখোমুখি হলেও তারা থেমে থাকেনি। ঘন জঙ্গল কেটে এবং দুর্গম পাহাড়ি ঢাল বেয়ে তারা এস্পিরিতু পাম্পা এলাকায় প্রবেশ করে সরেজমিন তদন্ত শুরু করে। বিবিসির সেই তথ্যচিত্র দলের অনুসন্ধানে স্যাভয়ের দাবির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ মিলেছিল। প্রাচীন ধ্বংসাবশেষে স্প্যানিশ নকশার কিন্তু ইনকা সংস্কৃতির প্রলেপযুক্ত ছাদের টাইলস আবিষ্কারের মাধ্যমেই মূলত এই স্থানের ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।
রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির তৎকালীন পরিচালক ও ইনকা বিশেষজ্ঞ জন হেমিং পরবর্তী সময়ে স্প্যানিশ ফাদার মার্তিন দে মুরুয়ার ঐতিহাসিক বিবরণীর সঙ্গে এই ধ্বংসাবশেষের মিল খুঁজে পান। মুরুয়ার ষোড়শ শতকের লেখায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে ইনকা রাজারা যে দ্বিমুখী প্রাসাদে বসবাস করতেন, তার ছাদ টালি দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। এই একটিমাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের সুবাদেই নিশ্চিত করা সম্ভব হয় যে এটিই ছিল ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া সেই কিংবদন্তি ভিলকাবাম্বা। তাছাড়া স্থানীয় আদিবাসীদের কিংবদন্তি এবং প্রাচীন বর্ণনার সঙ্গে বাস্তবের এই মিল ঐতিহাসিকদের দীর্ঘদিনের ধোঁয়াশা দূর করতে সাহায্য করে।
তবে ইনকা সভ্যতার এই শেষ রাজধানীর সন্ধান মিললেও গবেষকদের মতে এখনো বহু রহস্যের সমাধান বাকি রয়েছে। মূল আবিষ্কারের পর থেকে পেরুর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং প্রত্নতাত্ত্বিক দলগুলো এই অঞ্চলে নিয়মিত গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। ইনকা রাজাদের বিপুল পরিমাণ সোনা ও রত্নভাণ্ডারের একটি বড় অংশ আজও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, স্প্যানিশ দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ইনকা শাসকরা তাঁদের অমূল্য সম্পদ দুর্গম গুহা বা গভীর হ্রদের তলদেশে লুকিয়ে রেখেছিলেন। ইতিহাসের এই রোমাঞ্চকর অধ্যায় এবং প্রাচীন সভ্যতার নানা অজানা তথ্য আজও গবেষক ও ভ্রমণপিপাসুদের মনে গভীর বিস্ময় জাগিয়ে তোলে।
ইতিহাসের পাতায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে মানুষের অদম্য কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসা বহু অমীমাংসিত রহস্যের পর্দা উন্মোচন করতে সক্ষম। জিন স্যাভয় ও তাঁর সঙ্গীদের সেই দুঃসাহসিক অভিযান কেবল একটি হারানো নগরীই খুঁজে বের করেনি, বরং দক্ষিণ আমেরিকার প্রাচীন ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে। আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ইনকা সভ্যতার অবশিষ্টাংশ সংরক্ষণের কাজ বর্তমানে জোরেশোরে চলছে। পর্যটক ও গবেষকদের কাছে পেরুর আন্দিজ পর্বতমালা এবং আমাজনের গহীন অরণ্য তাই আজও এক পরম বিস্ময়ের নাম।
