পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বৃহস্পতিবার স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে তারা ভারতের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সামরিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে এবং প্রয়োজনে যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। ইসলামাবাদের এক উচ্চপর্যায়ের সংবাদ সম্মেলনে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। ঐতিহাসিক মারকা-ই-হক বা সত্যের লড়াইয়ের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এই বিশেষ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। যেখানে দেশটির সামরিক সক্ষমতার আধুনিক চিত্র এবং ভারতের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার কৌশলগত ফলাফল ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল শরিফ বলেন যে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সর্বদা সচেষ্ট এবং যেকোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণ নস্যাৎ করতে সক্ষম। গত বছরের পহেলগাম হামলা এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তানের অপারেশন বুনইয়ানুম মারসুস-এর সাফল্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন এই সংঘাতের মাধ্যমে ভারতের অনেক সাজানো বয়ান ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের উৎস হিসেবে তুলে ধরার যে চেষ্টা দিল্লি দীর্ঘকাল ধরে করে আসছে তা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। তিনি দাবি করেন পহেলগাম ঘটনার এক বছর পরও ভারত কোনো অকাট্য প্রমাণ দিতে পারেনি যা তাদের অভিযোগকে শক্তিশালী করে।
সংবাদ সম্মেলনে সেনা মুখপাত্র ১০টি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ফলাফল তুলে ধরেন। এর মধ্যে দ্বিতীয় ফলাফল হিসেবে তিনি দাবি করেন যে পাকিস্তান এখন দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতার প্রধান শক্তি হিসেবে স্বীকৃত। তিনি ভারতের বর্তমান সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কড়া সমালোচনা করে বলেন যে দিল্লির সামরিক বাহিনী এখন পেশাদারিত্ব হারিয়ে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ভারতের সামরিক কর্মকর্তারা রাজনৈতিক স্বার্থে যুদ্ধের উসকানি দিচ্ছেন যা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি। তিনি প্রশ্ন তোলেন যে কেন ভারতের অ্যাডমিরাল এবং জেনারেলরা নিজেদের হাস্যকর প্রমাণ করছেন।
চতুর্থ ফলাফল হিসেবে জেনারেল শরিফ উল্লেখ করেন যে ভারত মূলত তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও সংখ্যালঘুদের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনা আড়াল করতে পাকিস্তানের ওপর দায় চাপানোর কৌশল নেয়। কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে তিনি বলেন যে এটি একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিরোধপূর্ণ অঞ্চল এবং এর ভৌগোলিক বা জনসংখ্যাগত পরিবর্তন করার অধিকার দিল্লির নেই। তিনি স্পষ্টভাবে অভিযোগ করেন যে আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে ভারত পাকিস্তানে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। তবে পাকিস্তান এখন আর আগের মতো দুর্বল অবস্থানে নেই এবং যেকোনো সাইবার বা প্রথাগত যুদ্ধে লড়াই করার পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করেছে।
ব্রিফিংয়ে পাকিস্তানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জামের ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, আধুনিক ড্রোন ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার কামানের কার্যকারিতা দেখানো হয়েছে। জেনারেল শরিফ বলেন যে মারকা-ই-হক-এর সময় পাকিস্তান তার শক্তির মাত্র ১০ শতাংশ প্রদর্শন করেছিল। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে যদি কেউ পাকিস্তানকে পুনরায় পরীক্ষা করতে চায় তবে তাদের স্বাগত জানানো হবে। তবে তিনি যোগ করেন যে পাকিস্তান যুদ্ধ চায় না কিন্তু আত্মমর্যাদা রক্ষায় পিছু হটবে না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কৌশলগত দূরদর্শিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন যে সামরিক বাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
রিয়ার অ্যাডমিরাল শিফাত আলী এবং এয়ার ভাইস মার্শাল তারিক গাজীও সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয় যে সংঘাতের সময় ভারতীয় নৌবাহিনী আরব সাগরে উসকানিমূলক অবস্থান নিলেও পাকিস্তানের কার্যকর নজরদারি ও প্রস্তুতির মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। পাকিস্তানের এই সামগ্রিক অবস্থান এটিই স্পষ্ট করে যে পরমাণু শক্তিধর দুই প্রতিবেশীর মধ্যে যেকোনো সংঘাত পুরো বিশ্বের জন্য ভয়াবহ হতে পারে। তবে পাকিস্তান তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে ভারতের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিরোধের বার্তা দিয়েছে।
