সোমবার, ০২ মার্চ, ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২

আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলা: সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা

উম্মাহ কণ্ঠ মার্চ ২, ২০২৬, ০২:৩১ এএম
আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলা: সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা

আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলা | ছবি Ai

দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্ক এখন এক ভয়াবহ ও প্রকাশ্য যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে গভীর নিস্তব্ধতা চিরে আফগানিস্তানের আকাশসীমায় পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানের গর্জন এবং রাজধানী কাবুলসহ কান্দাহার ও পাক্তিয়া প্রদেশে শক্তিশালী বিস্ফোরণ এই সংঘাতকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সামরিক সূত্রগুলোর তথ্যমতে রাত আনুমানিক ১টা ৫০ মিনিট থেকে শুরু হওয়া এই বিমান হামলা আড়াইটা পর্যন্ত অব্যাহত ছিল যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এই অভিযানের পরপরই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা করেন যে কূটনৈতিক আলোচনার সময় শেষ এবং এখন থেকে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলো। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এই অভিযানের নাম দিয়েছে অপারেশন গজব লিল হক। তাদের দাবি অনুযায়ী সীমান্ত চৌকিতে আফগান বাহিনীর উসকানিমূলক হামলার জবাবেই এই পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এই সামরিক অভিযানে পাকিস্তান দাবি করেছে যে তারা তালেবানের অন্তত দুটি সেনা সদরদপ্তর তিনটি ব্রিগেড সদরদপ্তর এবং বিশাল গোলাবারুদের গুদাম ধ্বংস করেছে। হামলায় অন্তত ১৩৩ জন আফগান তালেবান সদস্য নিহত এবং দুই শতাধিক আহত হওয়ার দাবিও করা হয়েছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয় যে আশিটিরও বেশি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস করা হয়েছে। অন্যদিকে আফগান তালেবান প্রশাসনও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ শুরুতে পাল্টা হামলার কথা জানালেও পরে তা সরিয়ে নেন। তবে আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে তাদের লেজার নিয়ন্ত্রিত আধুনিক অস্ত্র ও নাইট ভিশন প্রযুক্তির সাহায্যে চালানো পাল্টা আক্রমণে অন্তত ৫৫ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়েছে এবং বেশ কয়েকজনকে বন্দী করা হয়েছে। যদিও এই হতাহতের সংখ্যা কোনো নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি।

এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মূলে রয়েছে ব্রিটিশ শাসনামলের তৈরি বিতর্কিত ডুরান্ড লাইন। ১,৬০০ মাইল দীর্ঘ এই সীমান্ত রেখাকে আফগানিস্তান কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। ২০২১ সালে তালেবান দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তান তাকে স্বাগত জানালেও ডুরান্ড লাইন এবং তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ইস্যুকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। পাকিস্তানের অভিযোগ টিটিপি আফগান ভূমি ব্যবহার করে খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। অপরদিকে কাবুল এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে পাকিস্তান তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যর্থতা ঢাকতে আফগানিস্তানের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। সামরিক শক্তির বিচারে পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর এবং বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বাহিনী হলেও আফগান তালেবানের দীর্ঘদিনের গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এই সংঘাতকে দীর্ঘমেয়াদী এবং জটিল করে তুলতে পারে।

ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী মুসলমানদের মধ্যে এই ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ইরশাদ করেছেন আর যদি মুমিনদের দুটি দল যুদ্ধে লিপ্ত হয় তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের ওপর জুলুম করে তবে তোমরা জুলুমকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:৯)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বিদায় হজের ভাষণে সতর্ক করেছিলেন যেন উম্মাহ একে অপরের রক্তপাতে লিপ্ত না হয় (সহীহ আল-বুখারী, ৪৪০৬)। এই সংকট নিরসনে কাতার ও তুরস্কের মতো দেশগুলো মধ্যস্থতার চেষ্টা চালালেও পরিস্থিতি এখনো থমথমে। এই সংঘাত এখনই না থামলে তা কেবল দুই দেশের জন্যই নয় বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ও দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনবে।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!