বর্তমান বিশ্ব এক অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী প্রযুক্তিগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ যোদ্ধা থেকে শুরু করে ইরানের মেধাবী বিজ্ঞানীদের যেভাবে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, তা কেবল কোনো সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী জ্ঞান ও প্রযুক্তির যুদ্ধের অংশ। পশ্চিমা শক্তি বিশেষ করে আমেরিকা তাদের সর্বাধুনিক সামরিক ও গোয়েন্দা প্রযুক্তি কেবল তাদের মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে প্রদান করছে, অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বকে সুকৌশলে মান্ধাতা আমলের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল করে রাখা হয়েছে।
এই চরম বৈষম্যের ফলে আরব ও মুসলিম দেশগুলো একদিকে যেমন বিপুল অর্থ ব্যয় করে পুরনো প্রযুক্তি কিনতে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে মেধাবী সন্তানদের হারিয়ে তারা বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের শিকার হচ্ছে। আমাদের দেশের মেধাবী তরুণরা উন্নত জীবনের আশায় যেভাবে পশ্চিমা বিশ্বে পাড়ি জমাচ্ছে, এই মেধা পাচার বা ব্রেইন ড্রেন মুসলিম উম্মাহকে কাঠামোগতভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এই সংকট আজ উম্মাহকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে তারা নিজেদের স্বকীয়তা হারিয়ে এক ধরনের মানসিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
মুসলিম উম্মাহর এই বর্তমান পরিস্থিতির সাথে প্রাচীন বনু ইসরাইলদের চারিত্রিক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দীর্ঘ দুইশ বছর ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকার ফলে আমাদের মানসিকতা অনেকটা সেই বনু ইসরাইলদের মতো হয়ে গেছে, যারা ফিরাউনের দাসত্ব করতে করতে নিজেদের নেতৃত্বের যোগ্যতা ও আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়েছিল। এই মানসিক দাসত্বের বিষবাষ্প আজ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে, যার ফলে মিথ্যা, দুর্নীতি এবং ধোঁকাবাজি এক স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। প্রকৃত নেতৃত্বের গুণাবলী আজ উম্মাহর মাঝে নেই বললেই চলে।
অথচ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তিনি চরম শত্রুর বিরুদ্ধেও কখনো ব্যক্তিগত কুৎসা বা কটু ভাষা ব্যবহার করেননি। আবু জাহেল বা আবু সুফিয়ানের মতো কট্টর শত্রুদের সাথে তার লড়াই ছিল আদর্শিক, ব্যক্তিগত কোনো বিদ্বেষ থেকে নয়। তিনি যদি আবু সুফিয়ানকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করতেন, তবে হয়তো তার অহংবোধ জেগে উঠত এবং তিনি কখনোই সত্য ধর্ম গ্রহণ করতেন না। আজকের নেতৃত্বের বড় অভাব হলো তারা সামান্য মতবিরোধে একে অপরকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে বসে, যা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে আরও বিভক্ত করে দেয়।
বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মূলত এক ধরনের আধুনিক গোলামি তৈরির কারখানা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই ব্যবস্থার ভিত্তি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা তাদের হলফনামায় সম্পদের যে হিসাব প্রদান করে, তার বড় একটি অংশই থাকে তথ্য গোপন ও মিথ্যাচারে পরিপূর্ণ। যারা মিথ্যার সংস্কৃতি ধারণ করে ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করে, তারা কখনোই একটি জাতিকে স্বাধীন ও মর্যাদাবান হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না। তারা ক্ষমতার মোহে পড়ে জাতিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক বয়ানে বিভক্ত করে ফেলে। অথচ একজন প্রকৃত নেতার কাজ হলো সবাইকে ভালোবাসার সুতোয় গেঁথে রাখা।
হুনাইনের যুদ্ধের পরবর্তী ঘটনাটি এখানে একটি অনন্য উদাহরণ হতে পারে। যুদ্ধের পর প্রাপ্ত বিপুল সম্পদ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কার নতুন মুসলিমদের এবং কুরাইশ নেতাদের দিয়ে দিলেন যাতে তাদের অন্তর ইসলামের প্রতি আরও আসক্ত হয়। কিন্তু এই বণ্টনে আনসার সাহাবীদের কোনো অংশ দেওয়া হয়নি, যারা ইসলামের প্রতিটি দুর্দিনে রক্ত দিয়েছিলেন। শয়তান যখন আনসারদের মনে ক্ষোভ সৃষ্টির চেষ্টা করল, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের এক তাঁবুতে ডেকে অত্যন্ত আবেগময় কণ্ঠে বললেন যে, তারা কি এতে খুশি নয় যে সবাই উট আর ভেড়া নিয়ে বাড়ি ফিরবে আর তারা তাদের সাথে করে আল্লাহর রাসূলকে মদিনায় নিয়ে যাবে? আনসাররা কান্নায় ভেঙে পড়লেন এবং বললেন যে তারা তাদের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলকে পেয়েই সন্তুষ্ট (সহীহ আল-বুখারী, ৪৩৩০)।
আধুনিক যুগের এই বিশাল মায়াজাল থেকে মুক্তির চাবিকাঠি হলো ঈমান বিল গায়েব বা অদৃশ্যের প্রতি অটল বিশ্বাস। ফিরাউনের দরবারে জাদুকররা যখন তাদের লাঠি ও রশি ছুড়ে ইলিউশন বা দৃষ্টিভ্রম তৈরি করেছিল, তা ছিল তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি। বর্তমানের থ্রিডি অ্যানিমেশন, ভিআর প্রযুক্তি বা গণমাধ্যমের তৈরি করা বিভ্রান্তিকর তথ্যের মায়াজাল ঠিক সেই জাদুকরদের জাদুর মতোই। কিন্তু মুসা (আলাইহিস সালাম) যখন আল্লাহর নির্দেশে লাঠি নিক্ষেপ করলেন, তা কোনো ইলিউশন ছিল না বরং এক বাস্তব সত্যে পরিণত হয়ে সমস্ত অলীক সাপগুলোকে গিলে ফেলল (সূরা আল-আরাফ, ৭:১২০-১২২)।
জাদুকররা প্রযুক্তির বিশেষজ্ঞ হিসেবে মুহূর্তেই সত্য অনুধাবন করে সিজদায় লুটিয়ে পড়েছিল। ফিরাউন যখন তাদের হাত-পা কেটে শূলে চড়ানোর হুমকি দিল, তখন তাদের অন্তরে ঈমান বিল গায়েব এতটাই জীবন্ত ছিল যে তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে পার্থিব জীবনের এই শাস্তি তাদের কাছে অতি তুচ্ছ (সূরা ত্বা-হা, ২০:৭২-৭৩)। ঈমান বিল গায়েবের এই শক্তিই আজ আধুনিক উম্মাহর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
এই ঈমানি শক্তি ও আল্লাহর সাথে গভীর সংযোগ অর্জনের প্রধান মাধ্যম হলো সালাত। সালাত কেবল একটি শারীরিক কসরত নয়, বরং এটি হলো সপ্তম আসমানের ওপর আরশে আজিমের মালিকের সাথে সরাসরি লাইভ কানেকশন। আমরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তেই বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগাযোগ করি, কিন্তু সালাতের মাধ্যমে একজন মুমিন সরাসরি তার রবের সাথে কথা বলে এবং আল্লাহ তার প্রতিটি তিলাওয়াতের জবাব দেন। এটিই হলো প্রকৃত স্বাধীনতা ও শক্তির উৎস। বদরের যুদ্ধে মাত্র ৩১৩ জন মুমিন যখন এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যুদ্ধের আগের রাতে সারারাত সিজদায় পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন।
তার সেই ব্যাকুল প্রার্থনা ও আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাসই মক্কার দাম্ভিক বাহিনীকে পরাজিত করতে সাহায্য করেছিল (সহীহ মুসলিম, ১৭৬৩)। সুতরাং আধুনিক এই প্রযুক্তিগত ও মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই ঈমান বিল গায়েবের শক্তিতে, গড়ে তুলতে হবে কোরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক ভ্রাতৃত্ব এবং সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। তবেই উম্মাহ তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে।

আপনার মতামত লিখুন :