আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম নতুন করে বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড ১৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। মঙ্গলবার এই ইল্ড বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে, যা ২০০৭ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর আর দেখা যায়নি। জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে এবং দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ নীতিগত সুদের হার আরও বাড়াতে বাধ্য হবে—বিনিয়োগকারীদের এমন আশঙ্কাই এই উল্লম্ফন তৈরি করেছে।
২০০৭ সালের পর সুদের এমন চাপ আর দেখা যায়নি।
মার্কিন আর্থিক বাজারে এই ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক। সাধারণ মানুষের গৃহঋণ থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায়ের ব্যক্তিগত ঋণের সুদ কত হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে এই বেঞ্চমার্ক বন্ডের হারের ওপর। ফলে বন্ড ইল্ড বাড়ার সরাসরি চাপ পড়ছে সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের কাঁধে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত নতুন করে ছড়িয়ে পড়ার পর মে মাসের পর প্রথমবারের মতো অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে।
তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা শুধু ওয়াশিংটনেই সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ড সোমবার ৩ দশমিক ৫৫৪ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা ২০০৯ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর সর্বোচ্চ; মঙ্গলবার তা সামান্য কমে ৩ দশমিক ৫৪৭ শতাংশে অবস্থান নেয়। একই চিত্র দেখা গেছে এশিয়ায়। জাপানের ১০ বছর মেয়াদি বন্ড ইল্ড চলতি সেপ্টেম্বর মাসে দ্বিতীয়বারের মতো ৩ শতাংশের সীমা অতিক্রম করেছে, যা দেশটির গত তিন দশকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের খরচ।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বগতি মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিতে পারে। মিৎসুবিশি ইউএফজে ব্যাংকের বিশ্লেষক ইয়োকো আকিকো এক নোটে জানিয়েছেন, অপরিশোধিত তেলের চড়া দাম বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার বাড়ানোর পথেই রাখবে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের কোনো রাজনৈতিক সমাধান না আসায় হরমুজ প্রণালীসহ প্রধান জ্বালানি সরবরাহ পথগুলো ক্রমাগত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। গত সপ্তাহে ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধারা বাব আল-মান্দেব প্রণালীর দিকে অগ্রসর হওয়ায় সৌদি আরবের বিকল্প তেল রফতানি পথও হুমকির মুখে পড়ে। এর কয়েক দিন পর ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেলের পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গত সপ্তাহে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়েছে। চলতি সপ্তাহে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ এবং ব্যাংক অব জাপানও নিজেদের নীতিনির্ধারণী বৈঠক শেষে সুদের হার আরও এক দফা বাড়াতে পারে বলে ধারণা করছে অর্থবাজার। একই সঙ্গে প্রযুক্তি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিপুল বিনিয়োগ টানতে করপোরেট বন্ডের প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন দেশের মাত্রাতিরিক্ত সরকারি ঋণের বোঝাও এই ইল্ড বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে জানা গেছে।
