সামাজিক ভীতি বা তীব্র উদ্বেগের কারণে সাধারণ মানুষের মেলামেশা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসা গবেষকরা। জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ ক্লিনিক্যাল সামাজিক উদ্বেগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। যুক্তরাজ্যের চিচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষাজীবনে এক-পঞ্চমাংশের বেশি শিক্ষার্থী এই মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হন, যা তাদের পড়াশোনার ফলাফল খারাপ হওয়া এবং মারাত্মক একাকীত্বের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দেয়।
অধিকাংশ মানুষ এই সমস্যাকে রোগের বদলে নিজেদের ব্যক্তিত্বের ত্রুটি মনে করেন।
যুক্তরাজ্যের সোশ্যাল অ্যাংজাইটি অ্যালায়েন্সের সভাপতি নিল গ্রিনিং জানিয়েছেন, নতুন কোনো পরিবেশে বা চাকরির সাক্ষাৎকারে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এই অনুভূতি যখন দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধার সৃষ্টি করে, তখনই তা রোগের রূপ নেয়। অনেকে নিজের এই দুর্বলতা ঢাকতে অতিরিক্ত চুপ থাকা, এক বা দুই শব্দে সংক্ষিপ্ত উত্তর দেওয়া, মানুষের চোখ এড়িয়ে চলার জন্য মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকার ভান করা কিংবা কথোপকথনে নিরাপদ কোনো বিষয় বেছে নেওয়ার মতো কৌশল অবলম্বন করেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার এবং দূরবর্তী কর্মপরিবেশের কারণে বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়ায় এই ভীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সামাজিক পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ব্যক্তির ভেতরে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হাত অবশ হওয়া এবং কথা হারিয়ে ফেলার মতো শারীরিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভিড ক্লার্ক জানিয়েছেন, এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য রোগীদের প্রথমে নিজেদের ওপর সারাক্ষণ নজরদারি চালানোর অভ্যাস বন্ধ করতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই কথা বলার সময় নিজেদের চেহারা লাল হচ্ছে কি না বা নিজের কথা অপ্রাসঙ্গিক শোনাচ্ছে কি না, তা নিয়ে অতিরিক্ত ভাবেন। এর পরিবর্তে কথোপকথন, আশপাশের পরিবেশ ও অপর ব্যক্তির কথার দিকে সরাসরি মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে কোনো বৈঠকে প্রশ্ন করা বা কোনো আড্ডায় অংশ নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা নেওয়ার মতো আচরণগত পরীক্ষা চালানো জরুরি।
আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে আচরণগত পরিবর্তনের মনস্তাত্ত্বিক থেরাপি, যা সাধারণ মানুষের নেতিবাচক চিন্তার ধারা পাল্টে দিতে সাহায্য করে।
অধ্যাপক ক্লার্ক উল্লেখ করেছেন, সামাজিক কোনো বৈঠকের পর সেটি নিয়ে বারবার মনের ভেতরে জটিল বিশ্লেষণ করা বন্ধ করতে হবে, কারণ বাস্তব ঘটনার চেয়ে কল্পনার স্মৃতি পরিস্থিতিকে অনেক বেশি খারাপভাবে উপস্থাপন করে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন, বন্ধুদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শ এবং ধাপে ধাপে সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত করার মাধ্যমে এই মানসিক সংকট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
