ইসলামে পরিচ্ছন্নতা ও পরিমিত সৌন্দর্যচর্চাকে ইবাদতের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে রাসুলুল্লাহ (স.) নিজে নিয়মিত চুলের যত্ন নিতেন এবং সাহাবিদেরও এ বিষয়ে উৎসাহিত করতেন। বর্তমানে সমাজে প্রচলিত ‘৩ ধরনের চুল রাখা সুন্নত’ কথাটি মূলত হাদিসে বর্ণিত রাসুল (স.)-এর পবিত্র চুলের তিনটি ভিন্ন সময়ের দৈর্ঘ্যের বিবরণ থেকে এসেছে। এটি কোনো নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক ফ্যাশন বা স্টাইল নয়, বরং নবীজির জীবনের বিভিন্ন সময়ের বাস্তব অবস্থার ঐতিহাসিক ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনা।
হাদিসের গ্রন্থগুলোতে রাসুল (স.)-এর চুলের তিনটি অবস্থার কথা স্পষ্ট পাওয়া যায়।
পবিত্র হাদিসের পরিভাষায় এই তিনটি দৈর্ঘ্যকে ওয়াফরাহ, লিম্মাহ ও জুম্মাহ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ইসলামিক আলেমগণ। প্রথম অবস্থাটি হলো ওয়াফরাহ, যার অর্থ কানের কাছাকাছি বা কানের লতি পর্যন্ত বিস্তৃত চুল। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে হজরত বারা ইবনে আজিব (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী (স.) মাঝারি গড়নের ছিলেন এবং তাঁর মাথার চুল দুই কানের লতি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সফর বা সাধারণ সময়ে যখন চুল কিছুটা ছোট থাকত, তখন সেটি এই পরিমাপের হতো বলে আলেমদের মত রয়েছে।
দ্বিতীয় দৈর্ঘ্যটিকে বলা হয় লিম্মাহ, যার অর্থ কানের নিচে থেকে কাঁধের কাছাকাছি পৌঁছানো চুল। সুনানে আবু দাউদ ও সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুল (স.)-এর চুল কখনো কান ও কাঁধের মাঝামাঝি স্তর পর্যন্ত পৌঁছাত। যখন চুল ওয়াফরাহ স্তর পার হয়ে আরও বড় হতো, তখন তা লিম্মাহর রূপ ধারণ করত। এটি ছিল নবীজির চুলের অন্যতম নিয়মিত একটি স্বাভাবিক অবস্থা।
চুলের তৃতীয় অবস্থাটি জুম্মাহ নামে পরিচিত, যা কাঁধ পর্যন্ত লম্বা বা বাবরি চুলকে নির্দেশ করে। হজরত আনাস (রা.) সহিহ বুখারিতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (স.)-এর চুল কখনো কখনো কাঁধ পর্যন্ত লম্বা হতো। এই তিনটি বিবরণ মূলত ভিন্ন ভিন্ন সময়ের, কারণ রাসুল (স.) সবসময় একই মাপে চুল রাখতেন না। বিভিন্ন সফর, হজ ও সাধারণ জীবনযাপনে সময়ের ব্যবধানে তাঁর চুলের দৈর্ঘ্য পরিবর্তিত হতো, ফলে এই তিনটির যেকোনোটি রাখাই সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।
হজ ও ওমরার সময়ে অবশ্য মাথা মুণ্ডন করা বা চুল ছোট করার একটি স্বতন্ত্র বিধান রয়েছে।
এর বাইরে মাথার কিছু অংশ কামিয়ে অন্য অংশ রেখে দেওয়াকে ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাকে পরিভাষায় ‘কাজা’ বলা হয়। সহিহ বুখারির বর্ণনা মতে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) জানিয়েছেন যে রাসুলুল্লাহ (স.) কাজা করতে স্পষ্ট নিষেধ করেছেন। আধুনিক যুগের যেসব হেয়ারকাটে মাথার একাংশ অস্বাভাবিকভাবে ছোট বা কামানো এবং অন্য অংশ লম্বা রাখা হয়, তা এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে বলে আলেমগণ সতর্ক করেছেন।
সুন্নাহ অনুযায়ী চুলের যথাযথ যত্ন নেওয়া এবং তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব। সুনানে আবু দাউদের একটি হাদিসে রাসুল (স.) ইরশাদ করেছেন, যার চুল আছে সে যেন তার যত্ন নেয়। চুলে নিয়মিত তেল ব্যবহার করা, চিরুনি করা এবং উস্কোখুস্কো বা এলোমেলো অবস্থা পরিহার করাই হলো ইসলামের মূল শিক্ষা।
