আমাদের সমাজে অনেক সময় একটি প্রচলিত প্রশ্ন শোনা যায় যে, বিয়ে না করলে কি জান্নাত পাওয়া যাবে না? এই বিষয়ে কুরআন, সুন্নাহ ও ইসলামি স্কলারদের মতামত অত্যন্ত স্পষ্ট। জান্নাত লাভের মূল ভিত্তি হলো বিশুদ্ধ ঈমান, আল্লাহভীতি বা তাকওয়া এবং নেক আমল। বিয়ে ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ এবং মানববংশ ধারা রক্ষার পবিত্র মাধ্যম হলেও এটি জান্নাত প্রবেশের একক বা অনিবার্য কোনো শর্ত নয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, আর যে ব্যক্তি মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করা হবে না (সূরা আন-নিসা, ৪:১২৪)। এই আয়াতে জান্নাত লাভের চাবিকাঠি হিসেবে ঈমান ও সৎকর্মকেই সাব্যস্ত করা হয়েছে।
ইসলামে বিয়েকে একটি মহৎ ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিয়ে করতে উৎসাহিত করেছেন এবং একে চরিত্র রক্ষার শক্তিশালী ঢাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নবীজি (সা.) বলেছেন, বান্দা যখন বিয়ে করে, তখন সে তার দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করে। অতএব বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে (সহীহ আল-বুখারী, ৫০৬৩)। এই হাদিসের মর্মার্থ হলো, বিয়ের মাধ্যমে মানুষ চারিত্রিক সুরক্ষা পায় যা তার দ্বীনদারির একটি বড় অংশকে রক্ষা করে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, কেউ অবিবাহিত থাকলে বাকি অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করতে সক্ষম হবে না।
ইসলামি ফিকহ বা আইনশাস্ত্র অনুযায়ী বিয়ের হুকুম ব্যক্তির শারীরিক, আর্থিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। যদি কারও বিয়ে না করলে পাপে লিপ্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে, তবে তার জন্য বিয়ে করা ফরজ। স্বাভাবিক সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা। কিন্তু কেউ যদি দ্বীনি জ্ঞান অর্জন বা অন্য কোনো বৈধ কারণে বিয়ে না করেন, তবে তিনি গুনাহগার হবেন না। ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যারা আজীবন অবিবাহিত ছিলেন কিন্তু তারা ছিলেন যুগের শ্রেষ্ঠ নেককার। ইমাম নববী (রহ.), ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এবং ইমাম তাবারির (রহ.) মতো মহান ব্যক্তিরা জ্ঞানচর্চায় মগ্ন থাকার কারণে বিয়ে করার সুযোগ পাননি।
অনেকে একটি হাদিস দিয়ে ভয় দেখান যেখানে রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয় (সহীহ আল-বুখারী, ৫০৬৩)। মুহাদ্দিসিনদের মতে, এখানে সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বলতে সুন্নতের প্রতি অবজ্ঞা, ঘৃণা বা বিয়েকে দ্বীনের অংশ মনে না করাকে বোঝানো হয়েছে। কেউ যদি বৈধ ওজর, শারীরিক অক্ষমতা বা দ্বীনি খেদমতে নিজেকে উৎসর্গ করার কারণে বিয়ে করতে না পারেন, তবে তিনি এই সতর্কবার্তার অন্তর্ভুক্ত হবেন না।
সারকথা হলো, বিয়ে একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কাজ এবং জান্নাতের পথকে সহজ করার মাধ্যম। কিন্তু এটি জান্নাতে প্রবেশের একমাত্র শর্ত নয়। কেউ যদি কোনো ওজরের কারণে বিয়ে না করেন কিন্তু ঈমান ও আমলের ওপর অটল থাকেন, তবে আল্লাহর রহমতে তিনি অবশ্যই জান্নাত লাভ করবেন। আল্লাহর করুণা এবং বান্দার ঈমান ও তাকওয়ার ওপরই জান্নাত প্রাপ্তি নির্ভরশীল, কেবল বৈবাহিক অবস্থার ওপর নয়। তাই অবিবাহিত থাকা বা বিয়ে করতে না পারার কারণে হতাশ হওয়ার কোনো অবকাশ নেই, বরং আমলে মশগুল থাকাই প্রকৃত সফলতা।
