বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক সময়ে ভূমিকম্পের তীব্রতা ও ঘন ঘন সংঘটিত হওয়ার ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের বৃদ্ধি দেখে অনেকেই প্রশ্ন করছেন, এগুলো কি কেয়ামতের কোনো সংকেত বা আলামত? ইসলামি শরিয়তের উৎসসমূহ—কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট। কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকম্পকে কেয়ামতের চূড়ান্ত সংকেত বলা না গেলেও, সামগ্রিকভাবে ভূমিকম্পের আধিক্যকে কেয়ামতের ছোট আলামত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সহীহ বুখারী শরীফে বর্ণিত একটি হাদিসে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে, খুনখারাবি বৃদ্ধি পাবে এবং ধন-সম্পদ এত বেড়ে যাবে যে তা উপচে পড়বে (সহীহ বুখারী, ১০৩৬)। হাদিসে ব্যবহৃত কাসরাতুয-জালাজিল বা ভূমিকম্পের আধিক্য শব্দটির মাধ্যমেই এটি প্রতীয়মান হয় যে, কেয়ামতের প্রাক্কালে পৃথিবী বারবার প্রকম্পিত হবে। আলেমরা একে কেয়ামতের ছোট আলামতগুলোর মধ্যে অন্যতম বলে গণ্য করেছেন।
আবার কুরআনের সূরা জিলজালে কেয়ামতের দিনের ভয়ংকর ভূমিকম্পের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যখন পৃথিবী তার প্রকম্পনে প্রকম্পিত হবে এবং পৃথিবী তার বোঝা বের করে দেবে। তবে এই বর্ণনা মূলত কেয়ামতের দিনের মহাপ্রলয় সম্পর্কে, যা বর্তমান সময়ের নিয়মিত ভূমিকম্পের চেয়ে ভিন্ন। তাই বর্তমানের সব ভূমিকম্পকে কুরআনের এই আয়াতের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা সঠিক হবে না। বরং এগুলোকে ইসলামের সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।
কিছু হাদিসে নৈতিক অবক্ষয়ের সঙ্গে দুর্যোগের সম্পর্ক নির্দেশ করা হয়েছে। তিরমিজী শরীফে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এই উম্মতের মধ্যে ভূমিধস, আকৃতি বিকৃতি এবং পাথর বর্ষণের আজাব ঘনিয়ে আসবে যখন গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপক প্রসার ঘটবে এবং মদপান ছড়িয়ে পড়বে (জামে তিরমিজি, ২২২১)। তবে কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকম্পকে নিশ্চিত গজব বা শাস্তি বলে ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ নেই। ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবার জন্য একই অর্থ বহন করে না। কারো জন্য এটি শাস্তি, কারো জন্য পরীক্ষা আবার কারো জন্য মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম হতে পারে।
একজন মুমিনের জন্য ভূমিকম্প আল্লাহর অসীম ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। কুরআন মাজিদে মুমিনের জীবনকে পরীক্ষা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে যেখানে ক্ষুধা, ভয় এবং জান-মালের ক্ষতির মাধ্যমে ঈমানের দৃঢ়তা যাচাই করা হয়। সূরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ঘন ঘন ভূমিকম্পের ঘটনা একজন সচেতন মুসলমানকে তওবা, ইস্তেগফার এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার নতুন সুযোগ করে দেয়।
কেয়ামতের নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। সূরা লুকমানের ৩৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, নিশ্চয়ই কেয়ামতের জ্ঞান আল্লাহর কাছেই রয়েছে। তাই ভূমিকম্পের আধিক্য দেখে হতাশ না হয়ে বা কেয়ামত অতি নিকটে ভেবে বিভ্রান্ত না হয়ে, মুমিনের উচিত নিজের আমলের হিসাব নেওয়া এবং পরকালের জন্য প্রস্তুতি জোরদার করা। প্রতিটি কম্পন আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই পৃথিবী নশ্বর এবং প্রকৃত নিবাস হলো আখেরাত।
