পৃথিবীর প্রথম সম্পর্ক হলো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। একটি সুখময় ও শান্তিময় দাম্পত্য জীবন সবারই কাম্য। কিন্তু অনেক সময় ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি বা অভ্যাসের কারণে সম্পর্কের ছন্দপতন ঘটে। মুফতি উমায়ের কোব্বাদীর দেওয়া ১০টি বিশেষ পরামর্শ মেনে চললে দাম্পত্য জীবনে সুখ ও ভালোবাসা অটুট রাখা সম্ভব।
১. শারীরিক ও মানসিক ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখুন
দাম্পত্য জীবনে শারীরিক ও মানসিক ঘনিষ্ঠতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সহধর্মিণীদের সঙ্গে গভীর ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখতেন। তিনি আলিঙ্গন ও চুম্বন করতেন, যা সম্পর্কের বাঁধন মজবুত করে।
হাদিস: রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে আলিঙ্গন, চুম্বন ইত্যাদি করতেন। (জাদুল মাআদ: ৪/২৫৩)
২. একে অপরকে `সিক্রেট` বা আদুরে নামে ডাকুন
পারস্পরিক ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সঙ্গীর জন্য এমন একটি আদুরে নাম ঠিক করুন, যা কেবল আপনারা দুজনই জানেন। এতে রাগ বা মান-অভিমানের সময়ও ভালোবাসার ঝংকার সৃষ্টি হয়। প্রিয় নবী (সা.) আয়েশা (রা.)-কে ‘হুমায়রা’ বা লাল গোলাপ বলে ডাকতেন। তবে এই একান্ত বিষয়গুলো অন্যদের সামনে এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
৩. পারস্পরিক বিশ্বাস অটুট রাখুন
বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই দাম্পত্য সম্পর্কের প্রাসাদ গড়ে ওঠে। সন্দেহ এমন একটি রোগ যা সম্পর্কের সুখ নষ্ট করে দেয়। তাই সঙ্গীর প্রতি অহেতুক সন্দেহ পোষণ করবেন না।
৪. তৃতীয় পক্ষকে নাক গলানোর সুযোগ দেবেন না
স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ঝগড়া বা সমস্যায় তৃতীয় কোনো পক্ষকে যুক্ত করা বিপজ্জনক। বিশেষ করে বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়দের হস্তক্ষেপ সম্পর্কের গভীরতা নষ্ট করে। মনে রাখবেন, যারা অন্যের দাম্পত্য জীবনে নাক গলায়, তাদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাই উত্তম।
৫. নিজেকে পরিপাটি রাখুন
স্বামী ও স্ত্রী—উভয়েরই একে অপরের জন্য পরিপাটি ও সুন্দর থাকা উচিত। ইবনু আব্বাস (রা.) বলতেন, "আমি আমার স্ত্রীর জন্য পরিপাটি থাকা পছন্দ করি, যেমনটি আমি আশা করি আমার স্ত্রী আমার জন্য পরিপাটি থাকুক।" (মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবা: ১৫৭১২)
৬. বলবেন কম, শুনবেন বেশি
একে অপরের কথা মন দিয়ে শোনার অভ্যাস করুন। সঙ্গীর কথা শেষ হওয়ার আগেই নিজের মতামত চাপিয়ে দেবেন না। ধৈর্য ধরে কথা শুনলে সম্পর্কের অনেক জটিলতা সহজেই সমাধান হয়ে যায়।
৭. মধুর স্মৃতিগুলো স্মরণ করুন
কখনও রাগ হলে বা মন খারাপ হলে সঙ্গীর সঙ্গে কাটানো সুন্দর সময়গুলোর কথা স্মরণ করুন। মনে রাখবেন, মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। একটি আচরণ খারাপ হলেও তার অনেক মুগ্ধকর আচরণ রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, "কোনো মুমিন পুরুষ কোনো মুমিন নারীকে (স্ত্রীকে) ঘৃণা করতে পারে না। তার একটি স্বভাবে সন্তুষ্ট না হলে অন্য স্বভাবে অবশ্যই সন্তুষ্ট হবে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৬৯)
৮. শয়তানকে জিততে দেবেন না
শয়তানের প্রধান কাজ হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো। যখনই আপনাদের মাঝে মনোমালিন্য হবে, মনে রাখবেন—এ সময় শয়তান সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায়। তাই শয়তানের প্ররোচনায় পা না দিয়ে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করুন।
৯. উত্তপ্ত অবস্থায় বিরতি নিন
আলোচনা উত্তপ্ত হতে শুরু করলে বিরতি নিন। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে অজু করুন, পানি পান করুন অথবা পরিস্থিতি থেকে সাময়িকভাবে সরে যান। এটি আপনার মস্তিষ্ককে `রিসেট` করতে সাহায্য করবে। মনে রাখবেন, রাগ ত্যাগ করাই উত্তম চরিত্রের লক্ষণ।
১০. ঝগড়া মেটাতে সহজ উপায় খুঁজুন
দাম্পত্য জীবনে টুকটাক মান-অভিমান স্বাভাবিক। তবে একে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেবেন না। কোনোভাবেই যেন তালাকের মতো জঘন্য বিষয় আলোচনার ধারেকাছে না আসে। একে অপরের প্রতি প্ররোচনা দেওয়া বা প্রতিশোধ নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। মনে রাখবেন, জীবনসঙ্গী হলো আপনার পরম বন্ধু, তাকে জয় করার মাধ্যম হলো ভালোবাসা ও মমতা।
দাম্পত্য জীবন সুখের করতে হলে প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ক্ষমা এবং ধৈর্য। মহান আল্লাহ আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই শিক্ষাগুলো আমল করার এবং সুখময় দাম্পত্য জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।
