শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ইসলামী অর্থনীতিতে সম্পদের সুষম বণ্টন ও বাইতুল মালের ইতিহাস

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১৩, ২০২৬, ০৪:১২ পিএম

ইসলামী অর্থনীতিতে সম্পদের সুষম বণ্টন ও বাইতুল মালের ইতিহাস

ইসলামী অর্থনীতি ও বাইতুল মাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত করার ঐতিহাসিক রূপরেখা নিয়ে শনিবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা এবং আরব নিউজ এক বিশেষ প্রতিপাদন প্রকাশ করেছে। ইসলামের মূল অর্থনৈতিক লক্ষ্য হলো নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কল্যাণমূলক সমাজ গড়ে তোলা। এই অর্থব্যবস্থা মূলত সুদ, ঘুষ এবং অনৈতিক ফটকাবাজি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে জাকাত, সদকা ও উশরের মতো কাঠামোগত ব্যবস্থার মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করে। ইসলামী দর্শনে সম্পদের চূড়ান্ত মালিক মানুষ নয় বরং মহান আল্লাহ এবং মানুষ কেবল পৃথিবীতে তাঁর আমানতদার বা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে।

এই অর্থব্যবস্থায় সম্পদ উপার্জন, উৎপাদন এবং ভোগের ক্ষেত্রে হালাল ও হারামের কঠোর ব্যবধান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টনের জন্য ইসলাম মূলত জাকাত, উশর, জিজিয়া এবং সদকাতুল ফিতরের মতো সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছে। এর বিপরীতে সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া, কালোবাজারি, অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন, চুরি, ডাকাতি, একচেটিয়া শোষণ, অসৎ মজুদদারি এবং যেকোনো ধরনের জুলুমকে সম্পূর্ণভাবে হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইসলামী অর্থনীতি মূলত রিবা বা সুদমুক্ত একটি সমাজ গঠন করতে চায় কারণ সুদভিত্তিক লেনদেনই মানব সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত।

ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান বৈষম্য দূর করার জন্য ইসলাম বাধ্যতামূলক দান বা জাকাত ব্যবস্থার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট উত্তরাধিকার আইন প্রবর্তন করেছে যা সমাজে কেবল এক জায়গায় সম্পদ পুঞ্জীভূত বা সঞ্চয় হওয়া রোধ করে। এই ব্যবস্থা সত্ ও স্বচ্ছ ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ এবং গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তা পরিশোধের কড়া নির্দেশ প্রদান করে যাতে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সুসম্পর্ক বজায় থাকে। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের একটি বড় দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা রয়েছে যা সম্পাদনে কেন্দ্রীয় কোষাগার বা বাইতুল মাল ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে থাকে।

পবিত্র কোরআনে অর্থনৈতিক জুলুম ও একচেটিয়া দখলদারি নীতির পথ বন্ধ করার জন্য পুঞ্জীভূত সম্পদের ওপর কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। সূরা আত-তাওবার চৌত্রিশ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও (সূরা আত-তাওবা, ৯:৩৪)। এই ঐশী নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো অর্থকে সমাজের সবার মধ্যে সঞ্চারিত করা এবং তা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কুক্ষিগত করে না রাখা। ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই যার জীবিকার ব্যবস্থা আল্লাহ করেননি বলে সূরা হুদের ছয় নম্বর আয়াতে যে ঘোষণা রয়েছে তা ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে (সূরা হুদ, ১১:৬)।

ইসলামের সূচনালগ্নেই মুসলিম সমাজে এমন এক অনন্য অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল যা ছিল ন্যায়, স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের সার্বিক কল্যাণের এক অনন্য উজ্জ্বল উদাহরণ। এই কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বাইতুল মাল বা মুসলিমদের কেন্দ্রীয় কোষাগার যেখানে রাষ্ট্রের সরকারি সম্পদ যেমন যুদ্ধলব্ধ সামগ্রী, কর, অনুদান এবং রাজস্ব সংরক্ষণ করা হতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিদের মধ্যে সর্বপ্রথম মুসলিমদের এই বিশেষ কোষাগারের মহান দায়িত্ব লাভ করেছিলেন প্রখ্যাত সাহাবি আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ। তবে ইসলামের ইতিহাসে এই বাইতুল মাল বা কেন্দ্রীয় কোষাগারের আনুষ্ঠানিক গোড়াপত্তন কে করেছিলেন তা নিয়ে আদি ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছুটা তাত্ত্বিক মতভেদ দেখতে পাওয়া যায়।

ঐতিহাসিক প্রথম মত অনুযায়ী প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক সর্বপ্রথম আস-সুনহ নামক স্থানে এই কোষাগারের গোড়াপত্তন করেছিলেন এবং তিনি সেখানে কোনো স্থায়ী প্রহরী নিয়োগ করেননি কারণ তাঁর শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল পারস্পরিক বিশ্বাস ও তাকওয়া। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রশাসনিক তদারকির সুবিধার্থে এই কোষাগারটি নিজের ঘরের একটি অংশে স্থানান্তর করেন যেখানে সংগৃহীত অর্থ ও সম্পদ দরিদ্র, অসহায় ও অভাবী মুসলিমদের মধ্যে নিয়মিত বণ্টন করা হতো। দ্বিতীয় মত অনুযায়ী দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব ছিলেন মুসলিমদের কোষাগার গোড়াপত্তনের প্রথম ব্যক্তি কারণ পূর্ববর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলাদা ভবন ছিল না। তবে প্রাচীন কিতাবুল খারাজ এবং তারিখুল খলিফা নামক গ্রন্থের অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে প্রথম মতটিই সঠিক এবং আবু বকর সিদ্দিকই এর মূল প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

যা কম স্পষ্ট তা হলো আধুনিক জটিল ব্যাংকিং ব্যবস্থার যুগে শতভাগ সুদমুক্ত এবং পুঞ্জীভূতকরণহীন এই প্রাচীন সাম্যবাদী অর্থনৈতিক মডেলকে হুবহু কীভাবে বিশ্বব্যাপী সফলভাবে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। ইসলামের প্রাথমিক যুগে বাইতুল মাল প্রতিষ্ঠা এবং তার সঠিক পরিচালনা মানবজাতির সামনে এক অনন্য অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই কোষাগারের প্রধান আয়ের উৎসগুলোর মধ্যে ছিল জাকাত, উশর, খুমুস তথা খনিজ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ, খারাজ বা ভূমি রাজস্ব এবং অমুসলিমদের জিজিয়া কর। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে খলিফা ওমর পরবর্তীতে দেওয়ান বা রাষ্ট্রীয় রেজিস্টার খাতা তৈরি করেন যা ছিল মূলত বিশ্বের প্রথম সুনির্দিষ্ট বাজেট পরিকল্পনা এবং এর মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের জন্য রাষ্ট্র নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করেছিল।

banner
Link copied!