সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩

রাসুলের (সা.) তরবারি ও আবু দুজানা: দায়িত্ব পালনের এক অনন্য শিক্ষা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১১, ২০২৬, ০৭:৫৯ পিএম

রাসুলের (সা.) তরবারি ও আবু দুজানা: দায়িত্ব পালনের এক অনন্য শিক্ষা

ইসলামের ইতিহাসে যেকোনো দায়িত্ব বা নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে যোগ্যতাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আমানত রক্ষার ক্ষেত্রে সক্ষমতা না থাকলে সেই দায়িত্ব গ্রহণ করা কেবল অনুচিতই নয়, বরং তা এক প্রকার খেয়ানত হিসেবেও গণ্য হয়। ঐতিহাসিক উহুদ যুদ্ধের একটি ঘটনা এই দর্শনকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। সহিহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি উজ্জ্বল তরবারি হাতে নিয়ে সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, কে এই তরবারিটি আমার কাছ থেকে গ্রহণ করবে? সাহাবায়ে কেরাম নবীজির হাতের সেই সৌভাগ্যের বস্তুটির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন এবং প্রত্যেকেই সেটি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন।

তবে মহানবী (সা.) কেবল কাউকে তরবারিটি দেওয়ার জন্য হাত বাড়াননি। তিনি একটি শর্ত জুড়ে দিয়ে বললেন, কে এর হক আদায়ের জন্য এটি গ্রহণ করবে? এই একটি প্রশ্নেই সাহাবিদের মধ্যে এক প্রকার গাম্ভীর্য নেমে আসে। কারণ রাসুল (সা.)-এর তরবারির ‘হক’ আদায় করা কোনো সাধারণ কাজ ছিল না। এটি ছিল শাহাদাত বা বিজয়ের পথে চরম আত্মত্যাগের প্রতিশ্রুতি। যখন অনেকেই দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, তখন সাহাবি আবু দুজানা (রা.) সামনে এগিয়ে আসেন এবং সেই তরবারির হক সম্পর্কে জানতে চান। রাসুল (সা.) জানান, এর হক হলো এটি দিয়ে মুশরিকদের মোকাবিলা করা যতক্ষণ না তা ভেঙে যায়। আবু দুজানা (রা.) সেই শর্ত মেনে নিলেন এবং বীরত্বের সাথে শত্রুদের ব্যুহ তছনছ করে দিয়েছিলেন।

এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা বহন করে। মুহাদ্দিসগণ এই হাদিস থেকে কয়েকটি মৌলিক শিক্ষা বের করেছেন। প্রথমত, নেক কাজে প্রতিযোগিতা করা সাহাবিদের বৈশিষ্ট্য ছিল। তবে সেই প্রতিযোগিতার মূল লক্ষ্য ছিল দায়িত্ব পালন করা, পদ দখল করা নয়। দ্বিতীয়ত, কোনো দায়িত্ব বা আমানত কেবল সেই ব্যক্তির হাতেই তুলে দেওয়া উচিত যে তার মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে। বর্তমানে আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই যোগ্যতার বদলে স্বজনপ্রীতি বা লবিংয়ের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করা হয়, যার পরিণাম হিসেবে পুরো প্রতিষ্ঠান বা জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইসলামি আইনবিদরা মনে করেন, কোনো ব্যক্তি যদি বোঝেন যে একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা তার নেই, তবে তা গ্রহণ না করাই হচ্ছে পরহেজগারি। দায়িত্ব কেবল একটি সুযোগ নয়, বরং কিয়ামতের মাঠে এটি একটি কঠিন জবাবদিহিতার জায়গা। আবু দুজানা (রা.)-এর সাহসিকতা আমাদের শেখায় যে, একবার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সেখানে আর পিছপা হওয়ার সুযোগ নেই। তিনি সেই তরবারি হাতে নিয়ে মাথায় লাল রুমাল বেঁধে যখন যুদ্ধের ময়দানে নামতেন, তখন সাহাবিরা বুঝতেন যে আজ তিনি মৃত্যুর শপথ নিয়েছেন। যোগ্যতার সাথে বীরত্বের এই মিশেলই ছিল ইসলামের সাফল্যের মূল শক্তি।

এদিকে বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই হাদিসের প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। যারা প্রশাসনের উচ্চপদে আছেন বা যারা সমাজ পরিচালনা করছেন, তাদের জন্য আবু দুজানা (রা.)-এর এই আদর্শ বড় মাপকাঠি। দায়িত্ব নেওয়ার আগে নিজের সক্ষমতা যাচাই করা এবং দায়িত্ব পাওয়ার পর তার পূর্ণ হক আদায় করা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। সাহাবায়ে কেরামের জীবন কেবল গল্পের জন্য নয়, বরং আমাদের প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে নৈতিকতার চর্চা করার জন্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) এই দৃষ্টান্তগুলো রেখে গিয়েছেন।

banner
Link copied!