মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩

উইম্বলডনের পোশাক বিতর্ক: মারিয়া বুয়েনোর সেই পিঙ্ক পোশাক

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ৩০, ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম

উইম্বলডনের পোশাক বিতর্ক: মারিয়া বুয়েনোর সেই পিঙ্ক পোশাক

ব্রাজিলিয়ান টেনিস খেলোয়াড় মারিয়া বুয়েনো ১৯৬২ সালের এক গ্রীষ্মের দিনে লন্ডনের অল ইংল্যান্ড ক্লাবে উইম্বলডনের টেনিস কোর্টে একটি বিতর্কিত গোলাপি অন্তর্বাস পরে খেলতে নেমেছিলেন যা পরবর্তীতে টুর্নামেন্টের পোশাকের নিয়ম কঠোর করতে বাধ্য করে বলে বিবিসি নিউজ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে। উইম্বলডনের পোশাক বিতর্ক টেনিস ইতিহাসের একটি অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হিসেবে পরিচিত। টেনিস ব্যালেরিনা নামে পরিচিত মারিয়া বুয়েনো যখন সেন্ট্রাল কোর্টে সাদা পোশাক পরে খেলতে নামেন তখন আপাতদৃষ্টিতে তাকে নিয়ম মেনে চলা খেলোয়াড় মনে হয়েছিল। তবে তিনি যখন সার্ভ করা শুরু করেন তখন দেখা যায় তার পোশাকের ভেতরের অংশ এবং অন্তর্বাস উভয়ই ছিল উজ্জ্বল গোলাপি রঙের যা গ্যালারিতে উপস্থিত দর্শকদের চমকে দেয়।

এই ঘটনার পর উইম্বলডন কর্তৃপক্ষ টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের জন্য সম্পূর্ণ সাদা পোশাক পরার নিয়ম কঠোরভাবে জারি করে। টেনিসের ফ্যাশন ও শৈলী নিয়ে রচিত একটি বইয়ের লেখক সুনিতা কুমার নায়ার জানিয়েছেন যে বুয়েনোর এই পোশাক সে সময় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বুয়েনো পরবর্তীতে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন যে তিনি যখন কোর্টের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গিয়ে সার্ভ করছিলেন তখন দর্শকদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি ক্লাবের tradition বা ঐতিহ্যবাহী সবুজ ও বেগুনি রঙের অন্তর্বাস পরলে কমিটির সদস্যরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং ১৯৬২ সালেই প্রধানত সাদা পোশাক পরার নিয়মটি লিখিতভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়।

অল ইংল্যান্ড লন টেনিস অ্যান্ড ক্রোকো ক্লাব ১৮৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই সাদা পোশাক পরার একটি প্রথা চালু ছিল তবে সেটি মূলত সামাজিক রীতির অংশ ছিল। টেনিস ইতিহাসবিদ রব লেক বিবিসি নিউজকে জানান যে ১৯৬০-এর দশকে ক্লাবের পুরুষ নিয়ন্ত্রিত committee বা কমিটি বাইরের সামাজিক পরিবর্তনগুলোকে সহজে গ্রহণ করতে পারেনি। কমিটি মনে করেছিল যে নারীদের এই ধরনের ফ্যাশনেবল পোশাক ক্লাবের ঐতিহ্যের পরিপন্থী এবং নারীদের উপস্থাপনার ওপর তারা কঠোর নজর রাখত। ডিজাইনার টেড টিনলিং এই বিতর্কিত পোশাকগুলো তৈরি করেছিলেন যিনি সে সময় উইম্বলডনের জাদুকর নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯৪০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে উইম্বলডনে অংশ নেওয়া প্রায় ৭৫ শতাংশ নারী খেলোয়াড়ই তার তৈরি পোশাক পরতেন।

এর আগে ১৯৪৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার খেলোয়াড় গাসি মরান লেস লাগানো অন্তর্বাস পরে খেললে কর্মকর্তারা তাকে টেনিসে পাপাচার ও অশ্লীলতা নিয়ে আসার জন্য অভিযুক্ত করেছিলেন। সেই সময় আলোকচিত্রীরা টেনিস কোর্টে শুয়ে তার পোশাকের ছবি তোলার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনার জেরে লিয়াজোঁ কর্মকর্তা হিসেবে থাকা টেড টিনলিংককে ক্লাব থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং পরবর্তী ৩০ বছরেরও বেশি সময় তাকে আর আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। যা কম স্পষ্ট তা হলো সমসাময়িক যুগে এই ধরনের কঠোর পোশাক নীতি আধুনিক খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে ঠিক কী ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছিল কারণ ঐতিহাসিক নথিতে কেবল সামাজিক শৃঙ্খলার কথাই গুরুত্ব পেয়েছে। ১৯১৯ সালেও ফরাসি খেলোয়াড় সুজান লেংলেন কর্সেট ও ফুল-লেংথ স্কার্ট বর্জন করে ছোট হাতার পোশাক পরে উইম্বলডনে বিতর্ক তৈরি করেছিলেন।

উনিশ শতকের শেষের দিকে যখন টেনিসে সাদা পোশাকের নিয়ম প্রবর্তন করা হয় তখন এই রঙের পোশাক মূলত উচ্চ সামাজিক মর্যাদার प्रतीक বা প্রতীক ছিল। সুনিতা কুমার নায়ার তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে কেবল ধনী ব্যক্তিরাই এই ধরনের সাদা ক্রীড়া পোশাক কেনা এবং তা রক্ষণাবেক্ষণ করার সামর্থ্য রাখতেন। সাধারণ মানুষের পক্ষে আলাদাভাবে খেলার পোশাক রাখা বা তা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব ছিল না। টেনিস ইতিহাসবিদ ক্রিস্টোফার বাওয়ার্স মনে করেন যে উইম্বলডন কর্তৃপক্ষ এই খেলাটিতে তাদের ঐতিহ্যগত আধিপত্য বজায় রাখার জন্য সাদা রঙের নিয়মটিকে আঁকড়ে ধরেছিল যা সময়ের সাথে সাথে কঠোর আইনে পরিণত হয়।

banner
Link copied!