মালয়েশিয়ায় ডুরিয়ান ফলের অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার বাজারে এই বিলাসবহুল ডুরিয়ান ফলের দাম হ্রাস পেয়েছে এবং কিছু স্থানে এটি বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে বলে মঙ্গলবার বিবিসি নিউজ ও এএফপি জানিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই অত্যন্ত জনপ্রিয় ও তীব্র গন্ধযুক্ত ফলটির উৎপাদন ২০২৬ সালে এসে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পাইকারি ও খুচরা বাজারে এর দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। সিঙ্গাপুরের পূর্বাঞ্চলীয় শহর ট্যাম্পাইনসের ডুরিয়ান নিনজা নামের একটি ফলের দোকানের সামনে গত কয়েক দিন ধরে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে কারণ সেই দোকানদার প্রতিদিন প্রায় ৬০০ কেজি ফল বিনামূল্যে বিতরণ করছেন। তবে সাধারণ ভোক্তারা এই সুযোগে কম দামে ফল কিনতে পেরে খুশি হলেও মালয়েশিয়ার হাজার হাজার প্রান্তিক চাষী ও খামারিরা চরম লোকসানের মুখে পড়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
মালয়েশিয়ার দীর্ঘমেয়াদী কৃষি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত এক দশকে দেশটির বিপুল সংখ্যক কৃষক রাবার ও পাম তেলের চাষ বাদ দিয়ে ডুরিয়ান চাষের দিকে ঝুঁকেছিলেন যার ফলশ্রুতিতে বাজারে এই আকস্মিক ধস বা ডুরিয়ান সুনামি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চীনের বাজারে উচ্চ চাহিদার কারণে চাষীরা মুসাং কিং নামের অত্যন্ত মূল্যবান একটি জাতের চাষ ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছিলেন যা আন্তর্জাতিক বাজারে ডুরিয়ানের হার্মিস নামে পরিচিত। নতুন বাগানগুলোর গাছ একসাথে পরিপক্ক হয়ে ফল দেওয়া শুরু করায় বাজারে ফলের বন্যা বয়ে গেছে এবং এটি সরাসরি রপ্তানি বাণিজ্যকে প্রভাবিত করেছে। মালয়েশিয়ার রাউব অঞ্চলের একাধিক ডুরিয়ান বাগানের মালিক লু ইউ থিং জানান যে গত বছরের ডিসেম্বর মাসেও তিনি প্রতি কেজি মুসাং কিং ফল খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সাড়ে ১৩ রিঙ্গিত বা প্রায় সাড়ে ৩ ডলারে বিক্রি করেছিলেন কিন্তু চলতি মাসে তিনি এর অর্ধেক দামও পাচ্ছেন না।
জহুর রাজ্যের আরেকজন চাষী ও বিক্রেতা হান সিং কেং জানান যে বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে তিনি তার মুসাং কিং ফলের দাম প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে প্রতি কেজি ৫০ রিঙ্গিতে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। বাজারে কম দামি স্থানীয় বা কামপুং ডুরিয়ানের পাশাপাশি ব্ল্যাক থর্ন ও মুসাং কিং-এর মতো প্রিমিয়াম জাতগুলোও এখন নামমাত্র মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। চাষীদের একাংশের মতে নতুন এবং অল্প বয়সী গাছ থেকে উৎপাদিত ফলের গুণগত মান সব সময় আন্তর্জাতিক রপ্তানির মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না যার ফলে সেগুলো স্থানীয় বাজারে কম দামে ছেড়ে দিতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত সরবরাহের সংকটের সাথে চলতি মৌসুমে বিরূপ আবহাওয়া ও অসময়ের ভারী বৃষ্টিপাত যুক্ত হওয়ায় ফলন প্রক্রিয়াকরণে চাষীদের দ্বিগুণ লোকসান গুনতে হচ্ছে যা পুরো কৃষি খাতকে সংকটের মুখে ফেলেছে।
মালয়েশিয়া ইন্টারন্যাশনাল ডুরিয়ান ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এডwyn চিয়াং কিন হো সংবাদমাধ্যমকে বলেন যে দেশের বৈচিত্র্যময় ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার প্রভাব ভিন্ন হয়েছে এবং কিছু অঞ্চলে স্বাভাবিক ফলন হলেও সামগ্রিক উৎপাদন চাহিদাকে ছাড়িয়ে গেছে। এই ভয়াবহ বাজার পরিস্থিতি ও দরপতন ঠেকাতে মালয়েশিয়ার ফেডারেল অ্যাগ্রিকালচারাল মার্কেটিং অথরিটি বা ফামা ক্ষুদ্র চাষীদের অর্থনৈতিক সুরক্ষায় জরুরি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ শুরু করেছে। সরকারি এই সংস্থাটি এখন চাষীদের কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট ভিত্তি মূল্যে সরাসরি ডুরিয়ান কেনা শুরু করেছে যাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট দূর হয়। সংস্থার ডেপুটি ডিরেক্টর ফয়সাল ইসওয়ার্দি ইসমাইল এএফপি নিউজ এজেন্সিকে জানিয়েছেন যে তারা আশা করছেন আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে এবং ডুরিয়ান ফলের দাম হ্রাস পাওয়ার এই ধারা কাটিয়ে চাষীরা আবার ন্যায্য মূল্য পাবেন। যা কম স্পষ্ট তা হলো এই সরকারি ক্রয়ের ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর কী পরিমাণ আর্থিক চাপ পড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে চীনের বাজারের বাইরে নতুন আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি করা সম্ভব হবে কিনা।
