ইরানের পক্ষ থেকে আসা যুদ্ধ বন্ধের সর্বশেষ প্রস্তাবকে সরাসরি অগ্রহণযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের এই কঠোর অবস্থানের পরপরই সোমবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। এশীয় বাজারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪.১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১০৫.৫০ ডলারে পৌঁছেছে। যদিও পরে তা সামান্য কমে ১০৩ ডলারে থিতু হয়, তবে বাজারের এই অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির একটি প্রতিবেদন থেকে। সেখানে জানানো হয় যে তেহরান পাকিস্তানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে একটি শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এই প্রস্তাবে সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া এবং ভবিষ্যতে আর কোনো আক্রমণ হবে না এমন সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দাবি করা হয়েছিল। তবে ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে এই প্রস্তাবের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে ইরানের তথাকথিত প্রতিনিধিদের এই প্রতিক্রিয়া তার কাছে মোটেও পছন্দ হয়নি এবং এটি পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের সূচনা হয়। যুদ্ধের শুরু থেকেই বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ রয়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের অবরোধের কারণে বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় জ্বালানির দাম গত কয়েক মাস ধরেই আকাশছোঁয়া। যদিও গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে এবং ২১ এপ্রিল ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়েছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক সমাধান এখনো অধরা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ১৪ দফার একটি শর্তনামা দিয়েছিল। এতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালীতে অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু ইরানের পাল্টা প্রস্তাবে এই বিষয়গুলোর কোনো পরিষ্কার সমাধান ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার অবস্থানে অনড় রয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ পুরোপুরি ধ্বংস না করা পর্যন্ত এই যুদ্ধ শেষ হবে না। নেতানিয়াহুর মতে যতক্ষণ পর্যন্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সচল থাকবে ততক্ষণ ইসরায়েল নিজেকে নিরাপদ মনে করবে না।
জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতার মধ্যেও বিশ্বের বড় তেল কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করছে। সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি আরামকো রবিবার জানিয়েছে যে ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে তাদের মুনাফা ২৫ শতাংশ বেড়ে ৩২.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের জানিয়েছেন যে তারা সমুদ্রপথের পরিবর্তে বিকল্প পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরবরাহ করায় অবরোধের নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে পেরেছেন। একই ভাবে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) এবং শেলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও এই যুদ্ধকালীন সংকটে তাদের মুনাফা দ্বিগুণের বেশি বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন ট্রাম্পের এই সর্বশেষ প্রত্যাখ্যানের ফলে চলমান অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে পাকিস্তান মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করলেও দুই পক্ষই তাদের নিজ নিজ শর্তে অনড়। একদিকে ইরান চাইছে সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তা এবং অবরোধ থেকে মুক্তি, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চাইছে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার পূর্ণ অবসান। এই দুই বিপরীতধর্মী অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি এখন গভীর সঙ্কটের মুখে পড়েছে যা পরোক্ষভাবে বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে রাখছে।
