মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক বেইজিংয়ের গ্রেট হল অফ দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় শুরু হওয়া এই বৈঠক নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দীর্ঘ হয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী হয়। রুদ্ধদ্বার এ বৈঠকে শি জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্টকে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন যে তাইওয়ান ইস্যুটি সঠিকভাবে সমাধান না হলে দুই দেশ সরাসরি সংঘাতের দিকে যেতে পারে। তবে আলোচনার শুরুতেই শি ইতিবাচক সুর বজায় রেখে বলেন বিশ্ব এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয় বরং সহযোগী হিসেবে দেখতে চায়।
বৈঠকের পর দুই নেতা বেইজিংয়ের ১৫ শতকের ঐতিহাসিক স্থাপত্য টেম্পল অফ হেভেন পরিদর্শনে যান। সেখানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শি জিনপিংকে একজন অসাধারণ নেতা হিসেবে অভিহিত করেন এবং বেইজিংয়ের সৌন্দর্যের প্রশংসা করেন। ট্রাম্প বলেন দুই পরাশক্তির মধ্যকার সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও উন্নত হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। যদিও তাইওয়ান নিয়ে শির কঠোর হুঁশিয়ারি প্রসঙ্গে ট্রাম্প কোনো সরাসরি মন্তব্য করেননি তবে তিনি পুরো আলোচনার পরিবেশকে চমৎকার বলে উল্লেখ করেছেন।
এবারের বেইজিং সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা। এদের মধ্যে টেসলার এলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াংয়ের উপস্থিতি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। ট্রাম্পের এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য হলো মার্কিন শিল্পের জন্য চীনের বাজার আরও উন্মুক্ত করা। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং চিপ তৈরির বাজারে মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখতে চীনের সহযোগিতা বা অন্তত বাজার সুবিধা নিশ্চিত করতে চান ট্রাম্প। এর আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছিলেন যে তিনি শিকে অনুরোধ করবেন যেন মার্কিন কোম্পানিগুলো চীনে তাদের দক্ষতা দেখানোর সুযোগ পায়।
আলোচনার টেবিলে তাইওয়ান ছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল বাণিজ্য শুল্ক প্রযুক্তি খাতের প্রতিযোগিতা এবং চলমান ইরান যুদ্ধ। উল্লেখ্য যে ইরান যুদ্ধের অবসানে চীনের সক্রিয় ভূমিকা কামনা করছে ওয়াশিংটন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন যে ইরানকে পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা কমানোর জন্য রাজি করাতে চীনের প্রভাব ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে। যেহেতু চীন এ অঞ্চলের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল তাই যুদ্ধ বন্ধ করা বেইজিংয়ের স্বার্থেই প্রয়োজন বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র।
তাইওয়ান ইস্যুটি বর্তমান সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। শি জিনপিংয়ের মতে তাইওয়ান স্বাধীনতা এবং এই অঞ্চলে শান্তি রক্ষা আগুনের সঙ্গে পানির মতো যা কখনোই একসঙ্গে চলতে পারে না। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করেছিল যা নিয়ে বেইজিং প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। যদিও সেই অস্ত্র সরবরাহ এখনো শুরু হয়নি তবে ট্রাম্পের এই সফরে বিষয়টি নিয়ে দর কষাকষির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
২০১৭ সালের পর এটিই কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফর। গত এক দশকে চীন আরও শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বেইজিং এখন নিজেকে একটি স্থিতিশীল বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী। ট্রাম্প ও শির এই বৈঠকের দিকে পুরো বিশ্ব তাকিয়ে ছিল কারণ দুটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আপাতত দুই নেতাই বন্ধুত্বের বার্তা দিলেও তাইওয়ান এবং ইরান যুদ্ধের মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সামনের দিনগুলোতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
