কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসারের কারণে ফিলিপাইনের বিশাল আউটসোর্সিং বা বিপিও খাতে কর্মরত লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছেন বলে বিবিসি নিউজের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মানুষের বিকল্প হিসেবে এখন যন্ত্রকে কাজে লাগাচ্ছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এর ফলে এই শিল্পে দীর্ঘকাল ধরে কাজ করা কর্মীরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে কনটেন্ট রাইটিং পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন লিসা। ছদ্মনাম ব্যবহার করা এই একক মায়ের গল্পটি বর্তমান প্রযুক্তিগত রূপান্তরের এক নির্মম বাস্তবতা। কলেজ পাসের পর থেকেই তিনি ফ্রিল্যান্সিং করতেন এবং পরে দেশের উদীয়মান আউটসোর্সিং শিল্পে একটি বড় কোম্পানিতে যোগ দেন। কাজের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন তিনি কখনো অনুভব করেননি। বিবিসিকে তিনি জানান যে তিনি সবসময় সময়মতো কাজ জমা দিতেন এবং তার পেশাদার দক্ষতা নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না।
কিন্তু নতুন চাকরিতে আট মাস পার হওয়ার পর এবং স্থায়ী কর্মী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার মাত্র এক মাস আগে তাকে আকস্মিকভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। এর আগের কয়েক মাস ধরে একটি জনসংযোগ সংস্থার হয়ে তিনি ও তার সহকর্মীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন লেখা সম্পাদনার কাজ করছিলেন। মূলত কোম্পানির নিজস্ব লেখার ধরন যন্ত্রকে শেখানোর জন্যই তাদের ব্যবহার করা হয়েছিল। লিসা আক্ষেপ করে বলেন যে তারা নিজেরাই সেই যন্ত্রকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যা শেষ পর্যন্ত তাদের জায়গা দখল করে নিয়েছে।
চাকরি হারানো এমন অনেক কর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি, যারা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। ছাঁটাইয়ের সময় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার শর্ত হিসেবে তারা কঠোর গোপনীয়তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছেন। এই ছোট নেটওয়ার্কের শিল্পে প্রকাশ্যে কথা বললে ভবিষ্যতে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি নষ্ট হতে পারে বলে তারা আতঙ্কিত।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে ফিলিপাইনের অর্থনৈতিক সাফল্যের অন্যতম বড় প্রতীক ম্যানিলার কুবাতো এলাকার মতো ব্যবসায়িক অঞ্চলগুলো। ২০০০ সালের প্রথম দিকে ভারতের বিকল্প হিসেবে ইংরেজি ভাষাভিত্তিক কাজের জন্য ফিলিপাইনকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা হয়। বর্তমানে এই খাতে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ কাজ করেন। প্রতি বছর এখান থেকে প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়, যা দেশটির মোট অর্থনীতির প্রায় ১০ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলও-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফিলিপাইনে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ কর্মী এমন পেশায় যুক্ত আছেন যা জেনারেটিভ মডেলের কারণে সরাসরি হুমকির মুখে পড়তে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ। আইটি অ্যান্ড বিজনেস প্রসেস অ্যাসোসিয়েশন অব দ্য ফিলিপিন্স-এর সভাপতি জ্যাক মাদ্রিদ স্বীকার করেছেন যে এই খাতে যন্ত্রের ব্যবহার অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাড়ছে। তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বর্তমানে এ ধরনের পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করছে।
জীবিকার এই চরম অনিশ্চয়তার সময়ে ইসলামি বিশ্বাস মানুষকে মানসিকভাবে দৃঢ় থাকতে সাহায্য করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন যে পৃথিবীতে বিচরণশীল এমন কোনো প্রাণী নেই, যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই (সূরা হূদ, ১১:৬)। আধুনিক প্রযুক্তিগত বিপ্লব বা কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে সাময়িক সংকট তৈরি হলেও, রিজিকের চূড়ান্ত ফয়সালা যে আসমান থেকে হয়, এই শাশ্বত বিশ্বাস মুসলিমদের নতুন দক্ষতা অর্জন ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সাহস জোগায়।
