বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সতর্কবার্তা ও বৈশ্বিক বিতর্ক

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সতর্কবার্তা ও বৈশ্বিক বিতর্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি কতটা দ্রুত মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, তা নিয়ে গবেষক ও শীর্ষ প্রযুক্তি কর্মকর্তাদের সতর্কবার্তা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ওয়্যার সার্ভিস ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, উন্নত এই প্রযুক্তি যেন মানুষের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য উন্নয়ন প্রক্রিয়া ধীর করা এবং সরকারি নীতিমালা প্রণয়নের দাবি উঠেছে। তবে এসব উদ্বেগের বিপরীতে রাজনৈতিক লাভক্ষতি এবং করপোরেট আধিপত্যের নতুন বিতর্কও সামনে আসছে।

নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় ক্রমেই বাস্তব রূপ নিচ্ছে।

প্রযুক্তিবিদ ইভান হুবিঙ্গার জানান, আগামী এক দশকের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে মানবজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকি ১০ শতাংশের বেশি হতে পারে। তিনি মূলত অ্যালগরিদমকে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। বর্তমান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি তুলনামূলক কম হলেও ভবিষ্যৎ সংস্করণের রূপরেখা নিয়ে প্রযুক্তিবিদরা উদ্বিগ্ন। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক থেকে সম্প্রতি পদত্যাগ করা গবেষক জেকব কক্সন জানিয়েছেন, প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য গতির কারণে এর ভেতরের কর্মীরা এখন সত্যিই আতঙ্কিত।

১৯৫০ সালে বিজ্ঞানী অ্যালান টুরিং প্রথম সতর্ক করেছিলেন যে বুদ্ধিমান যন্ত্র একসময় মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

সাধারণ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা যেখানে কেবল লেখার খসড়া তৈরি বা ভিডিও বানাতে পারে, সেখানে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চেয়েও বহুগুণ জটিল সমীকরণ মেলানোর দিকে এগোচ্ছে। অ্যানথ্রপিক প্রধান ডারিও আমোদেই জানিয়েছেন, প্রযুক্তিটি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দ্রুত বিকশিত হয়েছে এবং এটি এখন পরবর্তী প্রজন্মের মেধা নিজেই তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করছে। সম্প্রতি কিছু স্বয়ংক্রিয় টুল কোনো মানুষের সরাসরি নির্দেশ ছাড়াই স্বপ্রণোদিত হয়ে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে অনধিকার প্রবেশ করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ডারিও আমোদেই ও ওপেনএআই প্রধান স্যাম অল্টম্যান উন্নয়নের গতি কিছুটা শ্লথ বা নিয়ন্ত্রিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে তারা গবেষণার কাজ পুরোপুরি বন্ধ করার পক্ষে নন, বরং স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিতের কথা বলেছেন।

স্যাম অল্টম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের নতুন আইনের অপেক্ষায় বসে থাকবে না এবং নিরাপত্তার বিষয়ে বেসরকারি উদ্যোগেই সুরক্ষাবেষ্টনী তৈরি করতে হবে।

কিন্তু এসব সতর্কবার্তার পেছনে ভিন্ন স্বার্থ দেখছেন অন্য বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের আধিপত্য স্থায়ী করতে এবং নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীদের পথ বন্ধ করতে এই ভীতির প্রচার করছে। তাছাড়া অস্তিত্বের কাল্পনিক ঝুঁকির চেয়ে বর্তমানের তৈরি ডিপফেক ছবি, অপতথ্য ও আর্থিক জালিয়াতির বাস্তব ক্ষতি অনেক বেশি প্রকট। ব্রিটিশ সংসদ সদস্যদের এক যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম মেধার অপব্যবহারের কারণে মানবাধিকার সুরক্ষায় এখনই নতুন আইন প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে এই প্রযুক্তি নিয়ে বিপরীতমুখী অবস্থান স্পষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রযুক্তিগত এই ভীতিকে সরাসরি ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি আয়ারল্যান্ড সফরের সময় মন্তব্য করেন, কিছু পক্ষ এমন সব অপ্রয়োজনীয় বিষয় সামনে আনছে যা কখনোই ঘটবে না। মার্কিন প্রশাসনের লক্ষ্য কৃত্রিম মেধার প্রতিযোগিতায় চীনকে পেছনে ফেলে নেতৃত্ব ধরে রাখা। ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে উল্লেখ করেন, এই প্রযুক্তির সুরক্ষায় কোনো জটিল বিধিনিষেধের বদলে একজন দূরদর্শী নেতৃত্বই যথেষ্ট।

অপরদিকে মার্কিন চিপ ও যন্ত্রাংশের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নিজস্ব অবকাঠামো গড়ে তুলছে চীন। দেশটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়ে আসছে। মার্কিন গবেষকদের নিরাপত্তা উদ্বেগকে সংকীর্ণ মানসিকতা হিসেবে আখ্যায়িত করে বেইজিং জানিয়েছে, এমন বৈরী অবস্থান আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ সংকুচিত করে।

banner
Link copied!