বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩

গাড়ি যখন গোয়েন্দা: চালকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের অভিযোগ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৪, ২০২৬, ০১:০০ পিএম

গাড়ি যখন গোয়েন্দা: চালকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের অভিযোগ

এক সময় গাড়ি মানেই ছিল উন্মুক্ত আকাশ আর স্বাধীনতার প্রতীক। নিজের ইচ্ছেমতো স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানোর সেই দিনগুলো হয়তো আর ফিরবে না। কারণ, বর্তমান যুগের আধুনিক গাড়িগুলো আর কেবল যান্ত্রিক বাহন নয়, এগুলো একেকটি চাকাওয়ালা কম্পিউটার। আর এই সুযোগেই বড় বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো আপনার অজান্তেই আপনার ব্যক্তিগত জীবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য চুরি করছে। গাড়ি কোম্পানিগুলোর জটিল প্রাইভেসি পলিসি বা গোপনীয়তার নীতিগুলো ঘাঁটলে দেখা যায়, তারা চালকের নিখুঁত অবস্থান, গাড়িতে কে আছেন, রেডিওতে কী বাজছে, সিটবেল্ট বাঁধা হয়েছে কি না, এমনকি গাড়ি জোরে চালানো বা হঠাৎ ব্রেক কষার মতো আচরণও রেকর্ড করছে।

গোপনীয়তা লঙ্ঘনের এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে মজিলা ফাউন্ডেশনের ২০২৩ সালের একটি গবেষণায়। তারা বিশ্বের শীর্ষ ২৫টি গাড়ি ব্র্যান্ডের সিকিউরিটি ও প্রাইভেসি পলিসি পরীক্ষা করে দেখেছে যে, একটি কোম্পানিও তাদের ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। মজিলা তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করেছে, তাদের রিভিউ করা পণ্যের তালিকায় "গাড়িই হলো ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ক্যাটাগরি, যা মানুষের গোপনীয়তাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে।" এই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কিছু কিছু গাড়ি চালকের ওজন, বয়স, জাতি, এমনকি মুখের অভিব্যক্তিও রেকর্ড করতে সক্ষম। গাড়িগুলোর ভেতরে থাকা ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে এসব তথ্য অনায়াসেই ক্লাউড সার্ভারে চলে যাচ্ছে।

এখানেই শেষ নয়, এই ডেটা চুরির কারণে সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সংগৃহীত এই বিপুল পরিমাণ তথ্য লেক্সিসনেক্সিসের (LexisNexis) মতো বড় বড় ডেটা ব্রোকার বা তথ্য কেনাবেচা করা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে। আর তাদের কাছ থেকে তথ্য কিনে বিমা কোম্পানিগুলো চালকদের বিমার প্রিমিয়াম বা কিস্তির খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমেরিকার এক গাড়ি চালক নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, তাঁর বিমা খরচ হঠাৎ ২১ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, লেক্সিসনেক্সিসের কাছে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর গত ছয় মাসের প্রতিটি ভ্রমণের বিস্তারিত ১৩০ পৃষ্ঠার একটি লগ ফাইল রয়েছে, যা তাঁর গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি জেনারেল মোটরস (GM) বিক্রি করেছিল।

তথ্য বিক্রির এই অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আমেরিকার ফেডারেল ট্রেড কমিশন (FTC) সম্প্রতি কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। জেনারেল মোটরসকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য গ্রাহকের গাড়ি সংক্রান্ত তথ্য বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা অন্যান্য কোম্পানি বা থার্ড-পার্টি অ্যাপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হওয়ায় লুপহোল বা আইনি ফাঁকফোকর রয়েই গেছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসের তথ্যমতে, ২০২১ সালে রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির ৫০ শতাংশই ছিল ইন্টারনেট-সংযুক্ত এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৯৫ শতাংশে পৌঁছাবে। ফলে আগামী দিনে এই নজরদারি আরও ব্যাপক আকার ধারণ করতে যাচ্ছে।

ভবিষ্যতের পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। আমেরিকার একটি নতুন ফেডারেল আইনের কারণে গাড়ি কোম্পানিগুলো এখন বাধ্য হয়েই গাড়ির ভেতর ইনফ্রারেড বায়োমেট্রিক ক্যামেরা এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজ স্ক্যানার বসাবে। মূলত চালক মদ্যপ অবস্থায় আছেন কি না বা গাড়ি চালানোর সময় ঘুমিয়ে পড়ছেন কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য এই প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। তবে এর ফলে গাড়ি কোম্পানিগুলোর হাতে মানুষের স্বাস্থ্য, চোখের মণি নড়াচড়া ও আচরণের এক বিশাল ডেটাভাণ্ডার জমা হবে, যা তারা কীভাবে ব্যবহার করবে তা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন এখনো তৈরি হয়নি।

যদিও গাড়ি কোম্পানিগুলো দাবি করে যে এই সেন্সর ও কানেক্টিভিটি গাড়ি চালানোকে আরও নিরাপদ এবং আরামদায়ক করে তোলে, কিন্তু এর আড়ালে যে পুঁজিতান্ত্রিক ডেটা সাম্রাজ্য গড়ে উঠছে তা সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারকে খর্ব করছে। এই ডেটা কেবল বিজ্ঞাপনের জন্যই নয়, বরং চাকরি দেওয়া বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারির কাজেও ব্যবহার হতে পারে। তাই গাড়িতে ফোন কানেক্ট করার সময় বা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির টেলিম্যাট্রিকস সিস্টেমে সম্মতি দেওয়ার আগে আমাদের আরও সচেতন হওয়া জরুরি।

banner
Link copied!