জনপ্রিয় মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম হোয়াটসঅ্যাপ তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) চ্যাটবটের জন্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও গোপন ‘ইনকগনিটো’ মোড চালু করেছে। নতুন এই ফিচারের ফলে ব্যবহারকারী চ্যাটবটের সঙ্গে কী কথা বলছেন, তা স্বয়ং হোয়াটসঅ্যাপ বা এর মূল প্রতিষ্ঠান মেটাও পড়তে পারবে না। ইনকগনিটো মোডটি সক্রিয় করা হলে ব্যবহারকারীর কোনো প্রশ্ন কিংবা এআই-এর দেওয়া কোনো উত্তর সার্ভারে মনিটর করা হবে না। এমনকি চ্যাট শেষ হওয়ার সাথে সাথেই পূর্ববর্তী সমস্ত কথোপকথন ব্যবহারকারীর চ্যাট বক্স থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যাবে।
হোয়াটসঅ্যাপের প্রধান উইলি ক্যাথকার্ট এই নতুন ফিচারের যৌক্তিকতা তুলে ধরে জানিয়েছেন, মানুষ প্রায়শই এআই-এর সঙ্গে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং আর্থিক বিষয়গুলো অন্যতম। ব্যবহারকারীরা চান না যে তাদের এই অতি গোপনীয় তথ্যগুলো অন্য কারও কাছে সংরক্ষিত থাকুক কিংবা অন্য কেউ সেগুলো দেখুক। মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ এই উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এটিই বিশ্বের প্রথম কোনো বড় এআই পণ্য, যার কথোপকথনের কোনো লগ বা রেকর্ড কোম্পানির নিজস্ব সার্ভারে জমা রাখা হচ্ছে না।
এখানে একটি প্রযুক্তিগত বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন: নতুন এই ইনকগনিটো মোডটি হোয়াটসঅ্যাপের সাধারণ মেসেজের এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশনের মতো কাজ না করলেও এটি কার্যকারিতার দিক থেকে সমকক্ষ। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানি তাদের চ্যাটবট ব্যবহারের ডেটা সার্ভারে সংরক্ষণ করে এবং প্রিমিয়াম বা এন্টারপ্রাইজ অ্যাকাউন্ট ছাড়া সাধারণ ব্যবহারকারীদের ডেটা ভবিষ্যৎ এআই মডেল প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হয়। হোয়াটসঅ্যাপের এই নতুন পদক্ষেপ সেই প্রচলিত ধারায় বড় একটি পরিবর্তন নিয়ে এলো। ২০২৫ সালের মে মাসেই মেটা এআই বিশ্বব্যাপী এক বিলিয়নেরও বেশি ব্যবহারকারীর মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
তবে হোয়াটসঅ্যাপের এই অতি-গোপনীয় ফিচারের কারণে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা করছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। সারে ইউনিভার্সিটির সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অ্যালান উডওয়ার্ড বিবিসিকে জানিয়েছেন, এই ফিচারের কারণে এআই যদি কোনো ভুল বা ক্ষতিকর তথ্য দেয়, তবে তার জন্য হোয়াটসঅ্যাপের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ কোনো চ্যাট হিস্ট্রি বা প্রমাণ অবশিষ্ট থাকবে না। ইতিমধ্যে ওপেনএআই এবং গুগলের মতো বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠান তাদের চ্যাটবটের ভুল উত্তরের কারণে আইনি মামলার মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে আত্মহত্যার প্ররোচনা ও ভুল চিকিৎসার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মূল দুশ্চিন্তা হলো, যদি কোনো ব্যবহারকারী এই অদৃশ্য হয়ে যাওয়া চ্যাটের মাধ্যমে ক্ষতিকর বা আত্মহননমূলক কোনো সিদ্ধান্ত নেন, তবে মেটা বা আদালত কেউই তার প্রমাণ উদ্ধার করতে পারবে না। অবশ্য এই ঝুঁকি এড়াতে উইলি ক্যাথকার্ট জানিয়েছেন যে, প্রাথমিক অবস্থায় ইনকগনিটো মোডে কেবল টেক্সট বা লেখার সুবিধা থাকবে, কোনো ছবি প্রসেস করা যাবে না। এছাড়া মেটা এআই-এর নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা ‘গার্ডরেল’ অত্যন্ত কঠোর করা হয়েছে, যাতে ক্ষতিকর বা বেআইনি মনে হতে পারে এমন যেকোনো অনুরোধ চ্যাটবটটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে।
বিনিয়োগ খাতের বিশ্লেষক সুজানা স্ট্রিটার জানিয়েছেন, মেটা ২০২৬ সালের মধ্যে এআই অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ১৪৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার পরিকল্পনা করেছে। স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগকারীরা এই বিপুল খরচের বিপরীতে বড় ধরনের রিটার্ন বা লাভ দেখতে চান। হোয়াটসঅ্যাপ তাদের প্ল্যাটফর্মে মেটা এআই ছাড়া অন্য কোনো চ্যাটবট ব্যবহারের অনুমতি দেয় না। ফলে এই ইনকগনিটো মোডের মাধ্যমে কোটি কোটি ব্যবহারকারীকে নিজেদের প্ল্যাটফর্মে ধরে রেখে মেটা তাদের বিজ্ঞাপন ও কমার্স সাম্রাজ্যকে আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। তবে ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা বনাম গোপনীয়তার এই লড়াই আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, তা-ই এখন দেখার বিষয়
