১৯৬৩ সালের ২৫ মে ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় অর্গানাইজেশন অফ আফ্রিকান ইউনিটি বা ওএইউ গঠিত হয়েছিল। সেই দিনটিকে ঘিরেই আজ আফ্রিকা দিবস পালন করছে পুরো মহাদেশ। তেষট্টি বছর পেরিয়ে আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, স্বাধীনতা বলতে আসলে কী বোঝায়? একসময় যে মুক্তি মানে ছিল শুধু পতাকা ও জাতীয় সংগীত, আজ তার পরিধি অনেক বিস্তৃত। এখনকার আফ্রিকায় সার্বভৌমত্ব মানেই হলো সম্পদ, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক প্রভাবের ওপর নিয়ন্ত্রণ।এটি কেবলই একটি দিন।
প্রবীণদের কাছে আফ্রিকা দিবস আবেগঘন এক মাইলফলক। উপনিবেশবিরোধী কঠিন লড়াই ও রাজনৈতিক নিপীড়ন থেকে বেরিয়ে আসার প্রতীক এটি। কেনিয়ার মাচাকোসের ৭৪ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা জোসেফাত কিমানথি বলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা আমরা লড়াই করে পেয়েছি, একে কখনো খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তবে স্বাধীনতার সেই প্রতিশ্রুতি বর্তমান প্রজন্মের কাছে এখনো অধরা রয়ে গেছে।
আর্থিক দায়বদ্ধতা ও ঋণের বোঝা আজকের আফ্রিকায় স্বাধীনতার পথে বড় বাধা। বিভিন্ন দেশের সরকার এখন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের শর্তের কাছে অনেকটা জিম্মি। উন্নয়ন নীতি নির্ধারণে এখন আর আগের মতো স্বনির্ভরতা দেখা যায় না। একে একে পশ্চিমা শক্তি, চীন ও ব্রিকসের মতো ব্লকের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে সরকারগুলো নিজেরাই নিজেদের নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা হারাচ্ছে।আফ্রিকা এখন অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
কেনিয়ার মাল্টিমিডিয়া ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক পল এমবাতিয়া বলেন, একটি মহাদেশ যা উৎপাদন করে না কিন্তু ভোগ করে, তার সত্যিকারের স্বাধীনতা অসম্ভব। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও তথ্যের ওপর বাইরের নিয়ন্ত্রণ এখন নতুন করে আফ্রিকাকে এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলেছে। তথ্যভাণ্ডার বা ডেটা এখন যেখানে সংরক্ষিত, সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে আফ্রিকার প্রযুক্তি খাত।
ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। আফ্রিকা নিজেই এখন বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি হাব হতে চায়, কিন্তু সাবমেরিন কেবল বা ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের চাবিকাঠি এখনো বাইরের হাতে। ডিজিটাল এ নেও-কলোনিয়ালিজম বা নতুন উপনিবেশবাদই এখন আফ্রিকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।নতুন প্রজন্ম এখন ভিন্নভাবে ভাবছে।
আফ্রিকার জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বয়স ২৫ বছরের নিচে। লাগোসের ২৬ বছর বয়সী সফটওয়্যার ডেভেলপার চিনেদু এনওয়াসোর মতে, ১৯৫০ বা ৬০-এর দশকের স্লোগান আজকের বেকারত্ব বা উচ্চ জীবনযাত্রার সমস্যা সমাধান করছে না। তারা এখন আর কেবল বাইরের শক্তির দিকে আঙুল তোলে না, বরং নিজেদের সরকারের দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তরুণদের কাছে মুক্তি মানে এখন মর্যাদা ও বাইরের হস্তক্ষেপমুক্ত অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ।
আফ্রিকা দিবস এখন উদযাপনের চেয়ে পর্যালোচনার দিন হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভিত্তি হিসেবে কাজ করলেও, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ছাড়া এই সংগ্রাম এখনো অসম্পূর্ণ। সম্পদ ও উদ্ভাবনী শক্তি যতক্ষণ না মানুষের জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই লড়াই চলবে।
দিন শেষে কিমানথির কণ্ঠে ধ্বনিত হলো সেই অমোঘ সত্য, পতাকাগুলো আমাদের, কিন্তু অর্থনৈতিক সুতো এখনো বাইরের কারো হাতেই নাড়াচাড়া হচ্ছে।
