মঙ্গলবার, ০২ জুন, ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

সন্তানকে শিক্ষিত করার আগে মানুষ বানানোর আহ্বান শায়খ আহমাদুল্লাহর

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ২, ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম

সন্তানকে শিক্ষিত করার আগে মানুষ বানানোর আহ্বান শায়খ আহমাদুল্লাহর

রাজধানীর মিরপুরে এক বৃদ্ধার পচা-গলা লাশ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ শায়খ আহমাদুল্লাহ। সন্তানদের জাগতিকভাবে সফল ও শিক্ষিত করার আগে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তিনি দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান তাঁর লেখায় দেশের বর্তমান সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক স্খলন ও চরম বস্তুবাদী মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করেন।এই নির্মম ঘটনাটি পুরো সমাজ ও পারিবারিক মূল্যবোধকে এক বড় কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

গত ৩১ মে রাতে রাজধানীর মিরপুর সেকশন-৬ এর একটি আবাসিক ফ্ল্যাট থেকে ৭২ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম নামের এক বৃদ্ধার গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল পেয়ে পুলিশ ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। প্রাথমিক তদন্তের তথ্যানুযায়ী, ওই বৃদ্ধা অন্তত সাত থেকে আট দিন আগে মারা গিয়েছিলেন এবং তাঁর মরদেহটি দীর্ঘদিন ধরে ওই বন্ধ ঘরেই পড়ে ছিল। সবচেয়ে বড় নির্মমতা হলো, ওই বৃদ্ধার তিন ছেলেই সমাজে অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত, উচ্চশিক্ষিত ও সচ্ছল। তাঁদের একজন সরকারের যুগ্ম-সচিব পদে কর্মরত, একজন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং অন্যজন কানাডা প্রবাসী। এছাড়া ওই ফ্ল্যাটে বৃদ্ধার এক কন্যাও একসঙ্গে বসবাস করতেন, যিনি একই বাড়িতে অবস্থান করেও মায়ের মৃত্যুর খবর টের পাননি বলে পুলিশকে জানিয়েছেন।

এই পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার প্রসঙ্গ টেনে শায়খ আহমাদুল্লাহ তাঁর পোস্টে লিখেছেন যে, দেশের অধিকাংশ বাবা-মা তাঁদের সন্তানকে জাগতিক সফলতার যে স্বর্ণচূড়ায় দেখতে চান, নূরজাহান বেগমের তিন ছেলেই তা স্পর্শ করেছিলেন। কিন্তু মাঝখানে একটি বড় ধর্মীয় উৎসব বা ঈদ চলে গেলেও মা বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, সেই খোঁজ নেওয়ার ন্যূনতম সময় বা সুযোগ কেরিয়ারের পেছনে ছুটতে থাকা সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানদের হয়নি। ঘরের মধ্যে একা অবহেলায় মরে পড়ে থাকা মায়ের শরীরের মাংস খসে খসে পড়েছে, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য চরম লজ্জাজনক। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যে তথাকথিত সফলতা বাবা-মায়ের প্রতি ন্যূনতম ভালোবাসা ভুলিয়ে দেয় এবং মৃত্যুর সময়ে এক আঁজলা পানি নিয়ে মাথার পাশে বসার ফুরসত দেয় না, আমাদের তেমন বৈষয়িক সফলতার কোনো প্রয়োজন নেই।

ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং মানুষ হওয়ার মূল শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে সমাজ যতদিন শুধু বস্তুবাদ ও বৈষয়িক সফলতার পেছনে অন্ধের মতো ছুটবে, ততদিন এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নিয়তি হয়ে থাকবে। শায়খ আহমাদুল্লাহ তাঁর পোস্টের নিচে করা একটি মন্তব্যে আরও যোগ করেন যে, বর্তমানে সন্তানকে উন্নত জীবনের কথা বলে বিদেশে পাঠানো এক ধরনের সামাজিক মর্যাদা এবং অন্যের কাছে অহংকার করার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অথচ এই মেকি আভিজাত্য ও বৈষয়িক হাতছানি বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের নিঃসঙ্গতা ও সীমাহীন মানসিক কষ্টের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা যদি অল্পে তুষ্ট থেকে সন্তানকে বৈষয়িক প্রদর্শনের অনুষঙ্গ না বানিয়ে নিজের কাছে আগলে রাখতাম, তবে পরিবারবেষ্টিত বার্ধক্য অনেক বেশি আনন্দময় হতে পারত। পুলিশ পুরো ঘটনার পেছনে অন্য কোনো রহস্য বা অপরাধ আছে কি না তা খতিয়ে দেখছে।

banner
Link copied!