বিশ্বখ্যাত গ্রাফিক নভেল পারসেপোলিসের রচয়িতা এবং চলচ্চিত্র পরিচালক মারজান সত্রাপি ৫৬ বছর বয়সে পরলোকগমন করেছেন। বৃহস্পতিবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর কার্যালয় থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এএফপি এবং রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সত্রাপির পরিবারের পক্ষ থেকে এক বার্তায় বলা হয়েছে যে তার স্বামী ম্যাথিয়াস রিপার মৃত্যুর প্রায় এক বছর পর তিনি শোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন, তার প্রস্থান ফরাসি সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন এবং তিনি এমন একজন শিল্পী ছিলেন যিনি সব সময় স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেছেন।
মারজান সত্রাপির জন্ম ১৯৬৯ সালে ইরানের উত্তরঞ্চলীয় শহর রাশ্তে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব এবং পরবর্তীতে ধর্মীয় কট্টরপন্থা বৃদ্ধির কারণে তার বাবা-মা তাকে পড়ালেখার জন্য ১৯৮৩ সালে অস্ট্রিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি তেহরানে ফিরে আসেন এবং ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৪ সালে তিনি ফ্রান্সে পাড়ি জমান এবং জীবনের অধিকাংশ সময় সেখানেই অতিবাহিত করেন। তবে নিজের কাজের মাধ্যমে তিনি সবসময় ইরানের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তার সবচেয়ে জনপ্রিয় কাজ পারসেপোলিস প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে। এটি ছিল মূলত একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রাফিক নভেল, যেখানে তিনি ইরানের ইসলামী বিপ্লব এবং ইরাকের সাথে যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন। সাদাকালো স্কেচ এবং শক্তিশালী বর্ণনার মাধ্যমে বইটি পাঠককে সত্রাপির জীবনের সেই কঠিন বাস্তবতায় নিয়ে যায়। এই বইয়ের মূল উপজীব্য ছিল একজন স্বাধীনচেতা কিশোরীর বেড়ে ওঠার গল্প, যে তার বুদ্ধিবৃত্তিক বাবা-মায়ের ছত্রছায়ায় বড় হয়েছিল। সত্রাপি তার সাক্ষাৎকারে প্রায়ই বলতেন, তিনি এমন এক দেশ থেকে এসেছেন যেখানে একজন নারীর মূল্য একজন পুরুষের অর্ধেক ধরা হয়, কিন্তু নিজেকে তিনি কখনো দুর্বল মনে করেননি।
পরবর্তীতে পারসেপোলিস অবলম্বনে একটি অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়, যা বিশ্বজুড়ে অভূতপূর্ব সাফল্য পায়। ২০০৭ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে এটি জুরি প্রাইজ এবং ২০০৮ সালে অস্কারে সেরা অ্যানিমেটেড ফিচার ছবির জন্য মনোনীত হয়। এছাড়াও তিনি চিকেন উইথ প্লামস, দ্য ভয়েসেস এবং রেডিওঅ্যাকটিভের মতো চলচ্চিত্র নির্মাণে যুক্ত ছিলেন। রেডিওঅ্যাকটিভ চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছেন রোজামন্ড পাইক।
২০২৪ সালে ফ্রান্স সরকার তাকে তাদের সর্বোচ্চ সম্মান লিজিয়ন অফ অনার প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ইরানে গণতন্ত্রের জন্য লড়াইরত নারীদের পাশে ফ্রান্স সরকার যথাযথ ভূমিকা রাখছে না এমন অভিযোগ তুলে তিনি সেই সম্মান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফরাসি কর্তৃপক্ষকে লেখা এক চিঠিতে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, কেবল ফটোসেশন বা বক্তৃতার মাধ্যমে সমর্থন দিলে চলবে না, বরং লড়াইরত মানুষদের সত্যিকার অর্থে সহায়তা করতে হবে। তার এই সাহসী অবস্থান বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছিল। মারজান সত্রাপি কেবল একজন লেখক বা চলচ্চিত্রকার ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তার কাজ এবং জীবনদর্শন প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
