বৃহস্পতিবার, ০৭ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩

শিশুদের মাঝে দানশীলতার মানসিকতা গড়ে তোলার কার্যকর উপায়

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৬, ২০২৬, ১০:৫৫ পিএম

শিশুদের মাঝে দানশীলতার মানসিকতা গড়ে তোলার কার্যকর উপায়

শিশুদের চরিত্র গঠনে দানশীলতা বা বদান্যতার গুণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় অভিভাবকরা ভাবেন এটি হয়তো জন্মগত কোনো বৈশিষ্ট্য, কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন ভিন্ন কথা। লেক ইনস্টিটিউট অন ফেইথ অ্যান্ড গিভিং-এর গবেষক মেরেডিথ ম্যাকনাব মনে করেন, দানশীলতা কোনো অপরিবর্তনীয় স্বভাব নয় বরং এটি যথাযথ উদাহরণ, নিয়মিত অভ্যাস এবং আলোচনার মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে গেঁথে দেওয়া সম্ভব। তার মতে, শিশুরা বড়দের কাজ দেখে সবচেয়ে বেশি শেখে। তাই আমরা যা মুখে বলছি, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা নিজেরা কী করছি।

বড়দের একটি সাধারণ প্রবণতা হলো শিশুকে বলা যে ‍‍`দান করা ভালো‍‍`, কিন্তু নিজেরা সেই কাজে সক্রিয় না হওয়া। গবেষকরা বলছেন, ‍‍`আমি যা বলি তা করো, আমি যা করি তা নয়‍‍`—এই নীতি শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে মোটেও কার্যকর নয়। ধর্মীয় বা সামাজিক ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি এবং পরিবারের অভিভাবকরা যদি নিজেরাই উদারতা প্রদর্শন না করেন, তবে শিশুরা তা আত্মস্থ করতে পারে না। তারা হয়তো শৈশবে বড়দের এই উদারতার গভীর মানে বুঝতে পারে না, কিন্তু তারা এটি লক্ষ্য করে এবং বড় হওয়ার সাথে সাথে সেই পথ অনুসরণ করার মানসিকতা পায়।

দানশীলতা মানেই কেবল টাকা খরচ করা নয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ধারণাটি আরও ব্যাপক হতে পারে। অনেক সময় শিশুদের হাতে দেওয়ার মতো টাকা থাকে না, কিন্তু তাদের সময় এবং মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা থাকে। যেমন একটি শিশু যদি তার বন্ধুদের সাথে খেলার সময় নিজের খেলনা শেয়ার করে বা কারো বিপদে এগিয়ে আসে, সেটিও বড় ধরনের বদান্যতা। কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় সংগঠন শিশুদের ফোন ব্যবহারের পরিবর্তে সেই সময়টুকু একে অপরকে বা স্রষ্টাকে দেওয়ার পরামর্শ দেয়। একে বলা হয় মনোযোগের দান বা জেনারেসিটি অফ অ্যাটেনশন। এটি শিশুদের শেখায় যে অন্যের মঙ্গলের জন্য নিজের প্রিয় কিছু ত্যাগ করাই প্রকৃত উদারতা।

গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের উদারতা শেখানোর আরেকটি চমৎকার উপায় হলো সফল গল্পের উদযাপন। লিলি ফ্যামিলি স্কুল অফ ফিলানথ্রপির একটি প্রজেক্টে দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুদের এমন কিছু গল্প লিখতে বলা হয়েছিল যেখানে তারা নিজেরা অন্যের প্রতি উদার আচরণ করেছে। এই ধরনের স্মৃতিচারণ শিশুদের মনে এক ধরনের ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করে। তারা যখন বুঝতে পারে যে তাদের ছোট একটি কাজ অন্য কারো মুখে হাসি ফুটিয়েছে, তখন তারা বারবার সেই কাজ করতে আগ্রহী হয়। বিশেষ করে ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে যখন দানশীলতাকে জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে দেখানো হয়, তখন তা শিশুর মনে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে।

তবে বিষয়টি কেবল কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেই চলবে না। শিশুদের সাথে নিয়মিত আলোচনা করা প্রয়োজন যে কেন আমরা অন্যকে সাহায্য করছি। জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধাপে শিশুদের বোঝানো উচিত যে সমাজ বা মানুষের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা কতটুকু। পারিবারিক বাজেট বা সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে শিশুদের সাথে বয়স অনুযায়ী কথা বললে তারা বাস্তবসম্মত উদারতা শিখতে পারে। শেষ পর্যন্ত এই ক্ষুদ্র অভ্যাসগুলোই একদিন সমাজকে আরও মানবিক ও সহনশীল করে তোলে। প্রতিটি ধর্মীয় ঐতিহ্যে দানশীলতাকে একটি মৌলিক গুণ হিসেবে দেখা হয়, যা কেবল গ্রহীতার উপকার করে না বরং দাতার চরিত্রকেও শক্তিশালী করে।

banner
Link copied!