বর্তমান বিশ্বে তরুণ প্রজন্মের সংখ্যা ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। প্রায় ১.২ বিলিয়ন তরুণ বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ দখল করে আছে। এই বিশাল জনশক্তিকে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে এবং তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে `ইউথ ২০৩০` (Youth 2030) নামক এক উচ্চাভিলাষী কৌশল বাস্তবায়নের কাজ জোরদার করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সম্প্রতি এক বিশেষ অধিবেশনে জানিয়েছেন যে, তরুণরাই জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে নেতৃত্বের সামনের সারিতে রয়েছে।
তবে এই সম্ভাবনাময় গোষ্ঠীকে সঠিক দিকনির্দেশনা এবং সুযোগ না দিলে বৈশ্বিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তরুণদের বেকারত্ব এবং মানসম্মত শিক্ষার অভাব এখন এক বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘের এই নতুন কর্মপরিকল্পনায় মূলত পাঁচটি স্তম্ভের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, তরুণদের কণ্ঠস্বরকে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে সরাসরি পৌঁছে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি তরুণের জন্য মানসম্মত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে তরুণদের কারিগরি এবং ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি করা। চতুর্থত, সংঘাত ও যুদ্ধের মধ্যে থাকা তরুণদের সুরক্ষা প্রদান। এবং পঞ্চমত, তরুণ নেতৃত্বাধীন সামাজিক ও পরিবেশগত আন্দোলনগুলোকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা। জাতিসংঘের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ২৬ কোটি শিশু ও কিশোর বর্তমানে স্কুলের বাইরে রয়েছে এবং লাখ লাখ তরুণ সঠিক কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশায় ভুগছে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে ধনী দেশগুলোকে আরও বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
এদিকে এই কৌশল বাস্তবায়নে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাও এগিয়ে আসছে। বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে গ্রিন ইকোনমি বা পরিবেশবান্ধব অর্থনীতিতে তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। গবেষকরা মনে করেন, আগামী এক দশকে ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) প্রভাবে চাকরির বাজারে যে আমূল পরিবর্তন আসবে, তার সাথে মানিয়ে নিতে তরুণদের দক্ষ করে তোলা এখন সময়ের দাবি। জাতিসংঘের ইউথ এনভয় বা যুব দূত জানিয়েছেন যে, তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের সাথে কাজ করছেন যাতে জাতীয় বাজেটে তরুণদের উন্নয়নের জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা হয়। এটি কেবল একটি পরোপকারী উদ্যোগ নয় বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ।
উম্মাহ কণ্ঠের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তরুণদের এই ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার গুরুত্বও অপরিসীম। অনেক মুসলিম প্রধান দেশে তরুণদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করতে মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারগুলো বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সৃজনশীলতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলী বিকাশের পাশাপাশি তাদের মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা জাতিসংঘের এই ২০৩০ এজেন্ডার অন্যতম গোপন লক্ষ্য। যদি এই কর্মপরিকল্পনা সফল হয়, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবী এক বিশাল মেধাবী ও দক্ষ নেতৃত্ব পাবে যারা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।
