বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এবং ইরান-ইসরাইল সংঘাত কেবল কোনো সাধারণ যুদ্ধ বা নিছক সীমান্ত বিরোধ নয় বরং এটি হলো আধুনিক প্রযুক্তি ও আধিপত্য বিস্তারের এক সুদীর্ঘ জটিল লড়াই। ইসলামের এই ধরনের গভীর বিশ্লেষণধর্মী ও নির্ভরযোগ্য আলোচনার জন্য আপনারা নিয়মিত ভিজিট করতে পারেন উম্মাহ কণ্ঠের ওয়েবসাইট। এই সংঘাতের বিশাল প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এখানে মূলত বিশ্বশক্তির এক নতুন মেরুকরণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক ভয়ংকর প্রতিযোগিতা চলছে।
ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল এবং শিয়া রাষ্ট্র ইরান উভয়ই নিজেদের সামরিক ও প্রযুক্তিক শক্তি বৃদ্ধির সর্বোচ্চ চেষ্টা প্রতিনিয়ত চালিয়ে যাচ্ছে। নিকট অতীতের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে যখনই কোনো মুসলিম রাষ্ট্র বা নেতা নিজস্ব শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার চেষ্টা করেছে তখনই তাদের উপর নেমে এসেছে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর চরম আগ্রাসন। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন কিংবা লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পশ্চিমা বিশ্ব এবং ইসরাইল সর্বদা এই নীতিতে বিশ্বাসী যে বিশ্বের বুকে কোনো মুসলিম রাষ্ট্রকে কখনোই আধুনিক প্রযুক্তি বা পারমাণবিক শক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে দেওয়া যাবে না। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যই তারা মুসলিম দেশগুলোর উপর অর্থনৈতিক অবরোধ এবং প্রক্সি যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়।
আজকের আধুনিক মুসলিম বিশ্ব জ্ঞান এবং প্রযুক্তির দৌড়ে বাকি উন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে অথচ একসময় এই মুসলমানরাই ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিদ্যার অবিসংবাদিত পথিকৃৎ। আজ যখন পশ্চিমা বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সাইবার ওয়ারফেয়ার নিয়ে কাজ করছে সেখানে অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রগুলো আধুনিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় ব্যর্থ হচ্ছে। তারা নিজেদের আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে পশ্চিমা প্রভুদের তৈরি করা অস্ত্রের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে একপ্রকার দাসত্বের জীবন বেছে নিচ্ছে। মুসলমানদের এই পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ কেবল সামরিক শক্তির অভাব নয় বরং এর পেছনে রয়েছে এক গভীর আদর্শিক সংকট।
মুসলমানরা আজ তাদের ঈমানকে বিসর্জন দিয়ে দুনিয়াবী ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে পড়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মুমিনদের অভয় দিয়ে বলেছেন তোমরা হীনবল হয়ো না এবং চিন্তিতও হয়ো না তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হও (সূরা আল ইমরান, ৩:১৩৯)। অধিকাংশ মুসলমান আজ এই প্রকৃত ঈমানের শক্তি হারিয়ে শত্রুর প্রযুক্তির বিশালতা দেখে মানসিকভাবে পরাজিত হয়ে বসে আছে। অথচ প্রকৃত বিজয় কখনোই কেবল অস্ত্রের জোরে আসে না বরং তা আসে একমাত্র মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং অদৃশ্যের প্রতি অটল বিশ্বাসের মাধ্যমে।
ঈমান বিল গায়িব বা অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস হলো মুমিনের অন্তরের সেই শক্তি যা তাকে পৃথিবীর যেকোনো পরাশক্তির সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখায়। এই বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় উদাহরণ আমরা পাই আসহাবুল উখদুদ বা গর্তওয়ালাদের ঐতিহাসিক ঘটনায় যা মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বর্ণনা করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে ধ্বংস হয়েছিল গর্তওয়ালারা ইন্ধনপূর্ণ আগুনের গর্তওয়ালারা যখন তারা তার পাশে উপবিষ্ট ছিল এবং তারা মুমিনদের সাথে যা করছিল তা তারা প্রত্যক্ষ করছিল (সূরা আল-বুরূজ, ৮৫:৪-৭)। সহীহ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী এক বালক যাদুবিদ্যা শেখার পথে একজন পাদ্রীর সংস্পর্শে এসে তাওহীদের জ্ঞান লাভ করে।
বালকটি ঈমানের শক্তিতে অন্ধকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়া এবং কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করার অলৌকিক ক্ষমতা লাভ করে। জালিম বাদশাহ তাকে হত্যার জন্য পাহাড়ের চূড়া থেকে ফেলে দেওয়া এবং সমুদ্রে ডুবিয়ে মারার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় কারণ বালকটি আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছিল (সহীহ মুসলিম, ৩০০৫)। অবশেষে বালকটি নিজেই বাদশাহকে বলে দেয় যে তাকে হত্যা করতে হলে আল্লাহর নামে তীর নিক্ষেপ করতে হবে। বালকটির শাহাদাতের পর উপস্থিত জনতা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে। ক্রুদ্ধ বাদশাহ তখন অগ্নিকুন্ড তৈরি করে মুমিনদের পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেয় কিন্তু তারা হাসিমুখে আগুনে ঝাঁপ দেয় কারণ তারা জান্নাতের বাস্তবতাকে দেখতে পাচ্ছিল।
আসহাবুল উখদুদের এই ঘটনা শিক্ষা দেয় যে বাতিলের প্রযুক্তি যত ভয়ংকরই হোক না কেন ঈমান থাকলে মুমিনদের পরাস্ত করা অসম্ভব। কিন্তু বর্তমান যুগে আমরা এই ঈমানের শক্তি হারিয়ে ফেলেছি এবং সালাতকে অবহেলা করছি যা আল্লাহর সাথে যোগাযোগের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন হে মুমিনগণ ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩)।
বদরের যুদ্ধের ময়দানে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবী যখন হাজারো সুসজ্জিত কুরাইশ বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ সারারাত সালাতে রত থেকে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন যে আল্লাহ অবশ্যই তাঁর বিজয় ও সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবেন (সহীহ মুসলিম, ১৭৬৩)। আজ মুসলিম উম্মাহ বিপদের মুহূর্তে আল্লাহর দিকে সঠিকভাবে ফিরে যাচ্ছে না বরং তারা কেবল দুনিয়াবী হিসাব-নিকাশে অন্ধ হয়ে পড়েছে যা কখনোই প্রকৃত মুক্তি আনবে না।
আমাদের যেমন আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ও গবেষণায় সর্বোচ্চ উৎকর্ষতা অর্জন করতে হবে তেমনি আল্লাহর সাথে সম্পর্ককে নিবিড় করতে হবে। কেবল অস্ত্র দিয়ে যেমন পরাশক্তিগুলোকে হারানো সম্ভব নয় তেমনি আবার জ্ঞান অর্জন না করে শুধু আবেগের বশবর্তী হয়েও পৃথিবীতে টিকে থাকা অসম্ভব। বস্তুগত প্রস্তুতি এবং আসমানি সাহায্য এই দুইয়ের সমন্বয় প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ ﷺ শিখিয়েছেন যে দুর্বল মুমিনের চেয়ে শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে অনেক বেশি প্রিয় এবং উত্তম (সহীহ মুসলিম, ২৬৬৪)। তাই বর্তমান সংকটে মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব হলো নিজেদের বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং তাওহীদের পতাকাতলে সমবেত হওয়া।
আমাদের পুনরায় ফিরে যেতে হবে আসহাবুল উখদুদের অবিচল ঈমানের দিকে এবং বদরের সেই নিখাদ তাওয়াক্কুলের দিকে। তবেই মুসলিম উম্মাহর জন্য এক নতুন সোনালী ভোরের সূচনা হবে। মহান আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে জ্ঞান এবং প্রকৃত ঈমানের শক্তিতে বলীয়ান করে জালেম শক্তির বিরুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার তৌফিক দান করুন।

আপনার মতামত লিখুন :