স্কটল্যান্ডের ইনভারনেসের বাসিন্দা আলাস্টেয়ার মুনরো যখন প্রথমবার তার যৌনাঙ্গে একটি ছোট পিণ্ড বা লাম্প লক্ষ্য করেন, তখন তিনি বুঝতে পারেননি এটি তার জীবনকে আমূল বদলে দেবে। পেশায় এই নির্মাণ প্রকৌশলী প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি এবং প্রায় ছয় সপ্তাহ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া থেকে বিরত ছিলেন। তবে পিণ্ডটি বড় হতে শুরু করলে তিনি বুঝতে পারেন যে পরিস্থিতি সাধারণ নয়। শেষ পর্যন্ত যখন তিনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেন, তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তিনি জানতে পারলেন তিনি পেনাইল ক্যানসার বা যৌনাঙ্গের ক্যানসারে আক্রান্ত। এটি একটি অত্যন্ত বিরল রোগ যা স্কটল্যান্ডে প্রতি বছর মাত্র ৮০ থেকে ৯০ জন এবং পুরো যুক্তরাজ্যে প্রায় ৭০০ জন পুরুষের হয়ে থাকে।
রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত দ্রুত এবং বেদনাদায়ক। ইনভারনেসের রেইগমোর হাসপাতালের ইউরোলজিস্ট এবং পরবর্তীতে সিরাম সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ক্যানসারটি ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। মুনরোর জন্য সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তটি ছিল যখন তাকে জানানো হয় যে তার প্রাণ বাঁচাতে হলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার যৌনাঙ্গের ৩০ শতাংশ অংশ কেটে ফেলে দিতে হবে। দীর্ঘ সাত ঘণ্টার একটি জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সার্জনরা তার টিউমারটি অপসারণ করেন। ক্যানসারটি তার কুঁচকির লিম্ফ নোডগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছিল, যা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তুলে ফেলতে হয়। এরপর তার উরু থেকে চামড়া নিয়ে যৌনাঙ্গের পুনর্গঠন করা হয়।
এখানে একটি বিশেষ দিক হলো, মুনরো তার এই অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল অস্ত্রোপচারের পুরো প্রক্রিয়াটি বিবিসির একটি তথ্যচিত্রের জন্য ভিডিও করার অনুমতি দিয়েছিলেন। ‘সার্জনস: অ্যাট দ্য এজ অব লাইফ’ নামক এই তথ্যচিত্রে তার অস্ত্রোপচারের দৃশ্যগুলো দেখানো হবে। মুনরো নিজেই স্বীকার করেছেন যে ভিডিওটি দেখা বেশ অস্বস্তিকর এবং ভয়াবহ ছিল। বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের সময় তার শরীর থেকে ব্যাপক রক্তক্ষরণের দৃশ্য দেখে তিনি নিজেও অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কেন এই সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন তার পেছনে একটি মহৎ উদ্দেশ্য ছিল। মুনরো চান অন্য পুরুষরা যেন লজ্জা পেয়ে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি না করেন।
অস্ত্রোপচারের ছয় সপ্তাহ পর মুনরোকে আরও একটি ছোট অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয় কারণ প্রথমবার টিউমারের কিছু অংশ রয়ে গিয়েছিল। এরপর তাকে এক মাস ধরে রেডিওথেরাপি নিতে হয়েছে এবং অবশেষে গত ফেব্রুয়ারিতে চিকিৎসকরা তাকে ক্যানসারমুক্ত ঘোষণা করেন। তবে ক্যানসারমুক্ত হলেও তার জীবনের লড়াই এখনও শেষ হয়নি। অস্ত্রোপচার ও রেডিওথেরাপির জটিলতা হিসেবে তার ত্বকে লিম্ফেডিমা বা অস্বাভাবিক ফোলাভাব দেখা দিয়েছে। এর ফলে তিনি বর্তমানে স্বাভাবিকভাবে প্রস্রাব করতে বা যৌন মিলনে সক্ষম নন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আগামী এক বছর পর প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে এই অবস্থার উন্নতি করা সম্ভব হতে পারে।
সার্জন সিজে শুক্লা, যিনি মুনরোর এই অস্ত্রোপচারটি পরিচালনা করেছেন, তিনি একটি উদ্বেগজনক তথ্য শেয়ার করেছেন। তার মতে, যুক্তরাজ্যে স্কটল্যান্ডেই যৌনাঙ্গ ক্যানসারের হার সবচেয়ে বেশি এবং ২০৩০ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে এই হার আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ধূমপান, স্থূলতা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা এইচপিভি-কে এই রোগের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেক সময় চিকিৎসকরা প্রাথমিক অবস্থায় এটিকে ভুল করে ইস্ট ইনফেকশন বা ছত্রাকজনিত সমস্যা মনে করেন, যার ফলে সঠিক চিকিৎসা শুরু করতে অনেক দেরি হয়ে যায়।
আলাস্টেয়ার মুনরোর বার্তাটি খুব স্পষ্ট। তিনি বলেন যে যদি কোনো পুরুষের যৌনাঙ্গে কোনো দাগ, পিণ্ড, রক্তক্ষরণ বা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়, তবে তা ছোট বা তুচ্ছ মনে হলেও দ্রুত পরীক্ষা করানো উচিত। লজ্জা অনেক সময় জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। মুনরো বর্তমানে সুস্থ হয়ে আবার কাজে ফিরেছেন এবং তিনি জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা বা এনএইচএস-এর কর্মীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তার মতে, লজ্জা ত্যাগের মাধ্যমে যদি একজনের জীবনও বেঁচে যায়, তবে তার এই সংগ্রাম ও ভিডিও প্রচারের সিদ্ধান্ত সার্থক হবে।
