মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের অন্যতম প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া (ইউএসসি) নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং শিক্ষার উদ্দেশ্যে দান করা মানুষের মরদেহ মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আল জাজিরার ‘দ্য টেক’ পডকাস্ট এবং এজে প্লাস-এর এক যৌথ অনুসন্ধানে জানা গেছে যে, এই মরদেহগুলো লস অ্যাঞ্জেলেসে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অস্ত্রোপচার প্রশিক্ষণ দলে ব্যবহৃত হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, যারা এসব মরদেহ গবেষণার জন্য দান করেছিলেন, তাদের বা তাদের পরিবারের কোনো অনুমতি ছাড়াই এগুলোকে সামরিক প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা গেছে যে, ইউএসসি দাতা দেহগুলো মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে এবং পরবর্তীতে সেই সংস্থাটি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। এই প্রশিক্ষণ মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে জরুরি অস্ত্রোপচার এবং আহতের জীবন বাঁচানোর কৌশল শেখানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। সাধারণ মানুষ যখন তাদের দেহ বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য দান করেন, তখন তাদের উদ্দেশ্য থাকে জটিল রোগ নিরাময় বা নতুন চিকিৎসকদের জ্ঞান বৃদ্ধি করা। কিন্তু সেই পবিত্র দানকে যখন কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা গুরুতর নৈতিক ও আইনি প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এজে প্লাস-এর সিনিয়র প্রেজেন্টার ডেনা তাকরুরি এই পুরো বিষয়টিকে একটি ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দাতা আস্থার অপব্যবহার হিসেবে বর্ণনা করেছেন। লস অ্যাঞ্জেলেসে পরিচালিত এই গোপন প্রশিক্ষণে ইসরায়েলি সামরিক দলের উপস্থিতি এবং সেখানে মার্কিন দাতা দেহের ব্যবহার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেক শিক্ষার্থী এবং মানবাধিকার কর্মী দাবি করেছেন যে, গবেষণার নামে এমন বাণিজ্য এবং সামরিক খাতে দাতা দেহের ব্যবহার অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। বিশেষ করে যখন ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীরে চলমান যুদ্ধে লিপ্ত, তখন এই ধরনের প্রশিক্ষণ সহায়তা বিশ্বব্যাপী বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং মার্কিন নৌবাহিনীর এই পারস্পরিক চুক্তির ফলে দাতা দেহগুলো মূলত একটি লাভজনক পণ্যে পরিণত হয়েছে। এজে প্লাস-এর ডকুমেন্টারি এবং শিক্ষার্থীদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, দানপত্রের শর্তাবলীতে কোথাও সামরিক বা বিদেশি বাহিনীর প্রশিক্ষণে দেহ ব্যবহারের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে না। ফলে এটি কেবল দাতার শেষ ইচ্ছার অবমাননা নয়, বরং একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক জালিয়াতি হিসেবেও গণ্য হচ্ছে। এই কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর থেকে ক্যালিফোর্নিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অঞ্চলের দাতা পরিবারগুলোর মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে এই বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার ঝড় বইছে। সামরিক প্রশিক্ষণে মানুষের মরদেহ ব্যবহারের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইন এবং জেনেভা কনভেনশনের নীতির সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে আইনি বিশেষজ্ঞরা বিশ্লেষণ শুরু করেছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউএসসি-র এই কার্যক্রমের ফলে সাধারণ মানুষের মরদেহ দানের হার ভবিষ্যতে কমে যেতে পারে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রকৃত গবেষণাকে বাধাগ্রস্ত করবে। এই ঘটনার পর ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে প্রতিবাদীরা একটি পূর্ণাঙ্গ এবং স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
