বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩

৪৭ ডিগ্রি তাপদাহে গুজরাটের লবণ শ্রমিকদের মানবেতর জীবন

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৩, ২০২৬, ১০:৩১ পিএম

৪৭ ডিগ্রি তাপদাহে গুজরাটের লবণ শ্রমিকদের মানবেতর জীবন

ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটের মরুভূমিতে প্রতি বছর তীব্র তাপপ্রবাহের মোকাবিলা করতে হয় হাজার হাজার শ্রমিককে। দেশটির মোট লবণের চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশ উৎপাদন হয় এই রুক্ষ ও কঠিন পরিবেশে। লিটল রন অব কচ্ছ অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার মৌসুমি শ্রমিক বছরের আটটি মাস কাটিয়ে দেন যেখানে জীবন ধারণের ন্যূনতম সুবিধাও নেই বললেই চলে। এই শ্রমিকরা মরুভূমির লবণের স্তূপের ওপর কোনো বিদ্যুৎ বা স্থায়ী আবাসন ছাড়াই বসবাস করেন। এমনকি সুপেয় পানির জন্য তাদের দীর্ঘ ২৫ দিন অপেক্ষা করতে হয় একটি পানির ট্যাঙ্কারের জন্য। মরুভূমির এই চরম প্রতিকূলতায় কাজ করা শ্রমিকদের জীবন বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গ্রীষ্মকালে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা নিয়মিতভাবে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায় এবং কখনো কখনো তা ৪৭ থেকে ৪৮ ডিগ্রিতে পৌঁছায়। অথচ এই প্রচণ্ড শুষ্ক তাপই লবণ উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। বোরিং কূপের মাধ্যমে লোনা পানি অগভীর খনিতে পাম্প করে আনা হয় এবং প্রখর রোদে তা বাষ্পীভূত হতে দেওয়া হয়। শ্রমিকরা প্রতিদিন সকালে এবং সূর্যাস্তের পর এই লবণ নাড়াচাড়া করেন যাতে স্ফটিকীকরণ সঠিক উপায়ে সম্পন্ন হয়। ৪২ বছর বয়সী লবণ শ্রমিক বাবুলাল নারায়ণ জানান যে দুপুরের তীব্র গরমে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে তাই তারা কাজের সময়কে কয়েক ভাগে ভাগ করে নিয়েছেন।

মরুভূমিতে কোনো প্রাকৃতিক ছায়া বা গাছপালা না থাকায় শ্রমিকরা নিজেরাই অস্থায়ী ছাউনি তৈরি করে নেন। কাঠি ও মোটা কাপড়ের ফ্রেম তৈরি করে তার ওপর গাধার মল লেপে দেওয়া হয় যাতে রোদের তাপ থেকে কিছুটা মুক্তি পাওয়া যায়। ১৭ বছর বয়সী ভাবনা রাঠোর জানান যে এই পদ্ধতিটি ঘরকে ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করে এবং তাদের দুর্বলতা ও মাথা ঘোরা থেকে বাঁচায়। অনেকে আবার পানির পাত্রকে ভেজা কাপড় দিয়ে জড়িয়ে রাখেন যাতে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে পানি কিছুটা ঠাণ্ডা থাকে। তবে এই সংগ্রামী জীবনের বিপরীতে তাদের আয় অত্যন্ত নগণ্য। একটি পুরো মৌসুমে হাড়ভাঙা খাটুনির পর একজন শ্রমিকের ভাগে মাত্র কয়েক শ ডলার জোটে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে এই শ্রমিকরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। দীর্ঘ সময় লোনা পানি ও প্রখর রোদে কাজ করার ফলে তাদের শরীরে পানিশূন্যতা এবং কিডনির সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দেয়। ভারতের আবহাওয়া বিভাগ চলতি বছর গুজরাটে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস দিয়েছে যা শ্রমিকদের জন্য আরও ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে ডিজেল পাম্পের উচ্চ খরচের কারণে কাজ মার্চ মাসেই শেষ হয়ে যেত কিন্তু বর্তমানে সোলার পাম্পের সহজলভ্যতায় কাজের সময় গ্রীষ্মের প্রখর মাসগুলো পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে বিকল্প কোনো পথ না থাকায় বংশ পরম্পরায় এই শ্রমিকরা প্রতি বছর ফিরে আসেন এই আগুনের মরুভূমিতে। ৬৫ বছর বয়সী শ্রমিক রসোদা রাঠোর আক্ষেপ করে বলেন যে তাদের নিজস্ব কোনো জমি বা গবাদি পশু নেই তাই লবণ উৎপাদনই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

banner
Link copied!