মক্কায় সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়কে ঘিরে থাকা হাজিদের সায়ি কেবল একটি আচার নয়, বরং এটি এক গভীর আধ্যাত্মিক যাত্রার নাম। এই দুই পাহাড়ের সঙ্গে মিশে আছে ইসলামের ইতিহাসের এক অনন্য ত্যাগ ও ধৈর্যের উপাখ্যান। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ স্বয়ং এই পাহাড় দুটিকে তাঁর নিদর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং, হজ বা ওমরাহ পালনকারীদের জন্য সাফা ও মারওয়ার মাঝে সায়ি করা কেবল একটি বাধ্যতামূলক রুকনই নয়, বরং এটি আদি পিতা-মাতা থেকে শুরু করে ইবরাহিম (আ.) ও বিবি হাজেরার স্মৃতি রোমন্থনেরও একটি মাধ্যম।
এটি ত্যাগের মহিমা।
সাফা ও মারওয়া নাম দুটির পেছনেও রয়েছে ভাষাগত তাৎপর্য। আল্লামা ইবনে আশুর (রহ.)-এর মতে, সাফা হলো আবু কুবাইস পাহাড়ের চূড়া, যা মসৃণ ও কঠিন পাথর দ্বারা গঠিত। অন্যদিকে, মারওয়া হলো সাদা ও নরম পাথরের পাহাড়, যা প্রাচীনকালে আগুন জ্বালাতে ব্যবহৃত হতো। তাফসির বিশারদ ইমাম কুরতুবি (রহ.)-এর মতে, আদম (আ.) সাফা পাহাড়ের ওপর এবং মা হাওয়া (আ.) মারওয়া পাহাড়ের ওপর অবস্থান নিয়েছিলেন। সেই থেকেই এই স্থানগুলো ইতিহাসের পাতায় পবিত্র স্থান হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
বিবি হাজেরার আত্মত্যাগ ও জমজম কূপের উৎস
পবিত্র এই পাহাড়দ্বয়ের সঙ্গে সবচেয়ে গভীর যে ইতিহাস জড়িত, তা হলো ইবরাহিম (আ.), বিবি হাজেরা (রা.) ও শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)-এর সেই পরীক্ষার সময়। ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে শিশুপুত্র ইসমাইল ও তাঁর মা হাজেরাকে মক্কার নির্জন প্রান্তরে রেখে গিয়েছিলেন। সেখানে খাবার ও পানি ফুরিয়ে যাওয়ায় এক অসহ্য যন্ত্রণার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শিশুপুত্র তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়লে বিবি হাজেরা (রা.) অস্থির হয়ে ওঠেন। তিনি মানুষের সন্ধানে দ্রুত সাফা পাহাড়ের চূড়ায় ওঠেন, কিন্তু কাউকেও দেখতে না পেয়ে নিচে নেমে আসেন।
বিবি হাজেরা (রা.) এরপর দ্রুত বেগে মারওয়া পাহাড়ের দিকে ছুটে যান। এভাবেই তিনি সাতবার সাফা ও মারওয়ার মাঝে ছোটাছুটি করেছিলেন। তার এই ত্যাগ ও আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাসের প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে ইসমাইল (আ.)-এর পায়ের কাছে জমজম কূপের প্রবাহ তৈরি করেন। এই ঘটনা আজও প্রতিটি হাজির অন্তরে আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাসের বীজ বপন করে দেয়। ইসলামপূর্ব আরবের লোকেরা এখানে মূর্তি স্থাপন করে শিরক ও কুফরিতে লিপ্ত হয়েছিল, কিন্তু ইসলামের আগমনে সেই অন্ধকার দূর করে স্থানটিকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য পবিত্র ঘোষণা করা হয়।
ইবাদত ও দোয়ার স্থান
সাফা ও মারওয়ার মর্যাদার প্রধান কারণ হলো এটি আল্লাহর নিদর্শন। কোরআনে সূরা বাকারার ১৫৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে, এটি আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, সাফা ও মারওয়ার মাঝে সায়ি করা ওয়াজিব। এই স্থানটি কেবল ত্যাগের স্মৃতি নয়, এটি দোয়ার কবুলিয়াতের স্থান। রাসুল (সা.) সায়ি করার সময় সাফা পর্বতে দাঁড়িয়ে কাবাঘরের দিকে মুখ করে দোয়া করেছিলেন, যা থেকে বোঝা যায় এই স্থানটি কতটা বরকতময়।
যারা হজে গিয়ে এই পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সায়ি করেন, তারা মূলত সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠেন। তারা বিবি হাজেরার সেই আর্তনাদকে নিজেদের হৃদয়ে অনুভব করেন। এটি কোনো সাধারণ হাঁটাচলা নয়; এটি আল্লাহর ওপর পূর্ণাঙ্গ ভরসার বহিঃপ্রকাশ। একজন মুমিন যখন সাফা ও মারওয়ার মাঝে সায়ি করেন, তখন তিনি কেবল নিজের জন্য নয়, বরং গোটা মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহর রহমতের প্রার্থনা করেন। এই ইতিহাস আমাদের শেখায়, পৃথিবীতে যারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে সবর বা ধৈর্য ধারণ করেন, আল্লাহ তাদের জন্য অবারিত রহমতের দুয়ার খুলে দেন।
