মানুষের জীবন ভুল ও বিচ্যুতির ঊর্ধ্বে নয়। চলার পথে অবহেলা কিংবা ছোট-বড় গুনাহ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ইসলামের সৌন্দর্য হলো, এটি মানুষকে হতাশার অন্ধকারে ফেলে রাখে না। মহান আল্লাহ সব সময় বান্দার জন্য ফিরে আসার দরজা খোলা রেখেছেন। সেই ফিরে আসার অন্যতম মাধ্যম হলো তওবা ও ইস্তেগফার। তওবা অর্থ গুনাহ থেকে আন্তরিকভাবে ফিরে আসা, আর ইস্তেগফার অর্থ আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এটি কেবল গুনাহ মাফের আমল নয়, বরং এটি রিজিকে বরকত, দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি, অন্তরের প্রশান্তি এবং আখেরাতের সফলতার চাবিকাঠি।
গুনাহ মানুষের হৃদয়কে কঠিন করে দেয় এবং স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল করে ফেলে। কিন্তু আন্তরিক তওবা সেই দূরত্ব দূর করে দেয়। আল্লাহ তাআলা সুরা নিসায় ইরশাদ করেন, আর কেউ মন্দ কাজ করলে অথবা নিজের ওপর জুলুম করলে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে সে আল্লাহকে পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু পাবে (সুরা নিসা, ৪:১১০)। হাদিসে এসেছে, বান্দা যখন গুনাহ করে তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। এরপর সে তওবা ও ইস্তেগফার করলে সেই দাগ মুছে যায় এবং অন্তর আবার পরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠে (জামে তিরমিজি, ৩৩৩৪)। তাই অন্তরের পরিশুদ্ধি ও আত্মিক প্রশান্তি বজায় রাখতে ইস্তেগফারের বিকল্প নেই।
অনেক মানুষ অভাব, সংকীর্ণতা ও জীবনের নানা অপ্রাপ্তি নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকেন। অথচ কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইস্তেগফারকে রিজিক বৃদ্ধি ও প্রাচুর্য লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হজরত নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টিবর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান ও নহরসমূহের ব্যবস্থা করবেন (সুরা নূহ, ৭১:১০-১২)। মুফাসসিরদের মতে, এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের সহজ পথ হলো নিরন্তর ক্ষমা প্রার্থনা করা।
জীবনে এমন সময় আসে, যখন চারদিক অন্ধকার মনে হয়। নানা সমস্যা, ঋণ, পারিবারিক অশান্তি কিংবা মানসিক চাপ মানুষকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এ অবস্থায় ইস্তেগফার হতে পারে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি অধিক পরিমাণে ইস্তেগফার করবে, আল্লাহ তার প্রতিটি দুশ্চিন্তা দূর করে দেবেন, প্রতিটি সংকট থেকে বের হওয়ার পথ করে দেবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করবেন, যা সে কল্পনাও করেনি (সুনানে আবু দাউদ, ১৫১৮)। পাপাচার যখন ব্যক্তি ও সমাজে ব্যাপক হয়ে যায়, তখন আল্লাহর গজব ও শাস্তির আশঙ্কা থাকে। ইস্তেগফার সেই শাস্তি থেকে রক্ষার নিরাপত্তামূলক ঢাল হিসেবে কাজ করে।
প্রত্যেক মুমিনের বড় লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জন করা। পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন (সুরা বাকারা, ২:২২২)। গুনাহের পর অনুতপ্ত হয়ে যে বান্দা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও নিয়মিত ইস্তেগফার করতেন। তিনি প্রতিদিন সত্তরেরও বেশি বার ক্ষমা প্রার্থনা করতেন (সহিহ বুখারি, ৬৩০৭)। নবীজির এই সুন্নাহ থেকে বোঝা যায়, ইস্তেগফার আল্লাহর নৈকট্য ও আত্মিক উন্নতির জন্য কতটা অপরিহার্য। তওবা কবুল হওয়ার জন্য গুনাহের জন্য লজ্জিত হওয়া, তা বর্জন করা এবং ভবিষ্যতে আর না করার সংকল্প করা জরুরি। এই একটি আমলই আল্লাহর রহমতে একজন মানুষের জীবনের গতিপথ বদলে দিতে সক্ষম।
