সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩

ইসলামের দৃষ্টিতে দায়িত্ববোধের গুরুত্ব ও ফাঁকি দেওয়ার পরিণতি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১৩, ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম

ইসলামের দৃষ্টিতে দায়িত্ববোধের গুরুত্ব ও ফাঁকি দেওয়ার পরিণতি

ইসলামে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে দায়িত্ববোধের গুরুত্ব অপরিসীম এবং অর্পিত দায়িত্ব এড়িয়ে চাতুর্যের মাধ্যমে সুবিধা ভোগের মানসিকতা সম্পূর্ণ অনৈসলামিক বলে প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলাররা শনিবার উম্মাহ কণ্ঠের এক বিশেষ ধর্মীয় আলোচনায় উল্লেখ করেছেন। মানব সভ্যতার অগ্রগতি, প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য এবং পারস্পরিক সামাজিক আস্থার mূলে এই গুণের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। একজন প্রকৃত মুমিনের জন্য তাঁর ঈমানের মৌলিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পারিবারিক, পেশাদারি এবং রাষ্ট্রীয় कर्तव्य পালন করা সমানভাবে জরুরি। কিন্তু বর্তমান সমাজে এমন একটি নেতিবাচক প্রবণতা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে যেখানে অনেকে সুযোগ পেলেই নিজের মূল कर्तव्य পালনেন চরম শৈথিল্য প্রদর্শন করেন এবং চাতুর্যের মাধ্যমে অন্যায় সুবিধা গ্রহণ করেন। বাহ্যিকভাবে এদের সফল মনে হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এটি স্পষ্ট নৈতিক অবক্ষয় এবং আমানতের খিয়ানতের অন্তর্ভুক্ত।

ইসলামিক আইন ও দর্শনে প্রতিটি সামাজিক বা প্রশাসনিক দায়িত্বকে একটি পবিত্র আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন যে নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তাদের হকদারের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে (সূরা আন-নিসা, ৪:৫৮)। অর্পিত আমানতের হক আদায় না করে কেবল সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা ইসলামী নৈতিকতার পরিপন্থী কাজ। প্রকৃত বিশ্বাসীদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তারা তাদের আমানত ও অঙ্গীকারের ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নশীল থাকে (সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:৮)। দায়িত্ব পালনে উদাসীন থেকে যারা শুধু পদোন্নতি, মূল্যায়ন বা সম্মান অর্জনের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে, তাদের এই মানসিকতা ইসলামের দৃষ্টিতে তাকওয়ার পরিপন্থী। সামাজিক সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজের কাজের প্রতি সৎ হতে হবে।

এর প্রকৃত অর্থ হলো, যারা নিজেরা কাজ না করে অন্যের কাজের কৃতিত্ব নিজের নামে চালাতে পছন্দ করে, তাদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা রয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে যে যারা তাদের কৃতকর্মের প্রতি খুশি হয় এবং যা তারা করেনি তা নিয়ে প্রশংসিত হতে পছন্দ করে, তাদেরকে শাস্তি থেকে মুক্ত মনে কোরো না এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি (সূরা আলে عمران, ৩:১৮৮)। এই ধরনের মানসিক ব্যাধি চাতুর্যের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা গ্রহণকারী বা পদাভিলাষী মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে দেখা যায়। যা কম স্পষ্ট তা হলো, প্রাতিষ্ঠানিক প্রধানরা কীভাবে চাটুকারিতা এবং প্রকৃত যোগ্যতার মধ্যে নিখুঁত পার্থক্য নিশ্চিত করবেন। তবে আল্লাহর রাসুল সতর্ক করে বলেছেন যে তোমরা সবাই দায়িত্বশীল এবং সবাইকে তোমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে কিয়ামতের দিন প্রশ্ন করা হবে (সহীহ আল-বুখারী, হাদিস ৮৯৩)। এই নির্দেশনা স্পষ্ট করে যে অর্পিত দায়িত্ব পালন কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয় বরং এটি পরকালীন জবাবদিহিতার সাথে সরাসরি যুক্ত।

অবশ্য মানুষের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব পরিস্থিতির কারণে ঘটে যাওয়া অনিচ্ছাকৃত ত্রুটিকে ইসলাম ইচ্ছাকৃত গাফিলতি থেকে আলাদা করে দেখে। মানুষের সামর্থ্যের বাইরে কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে যেমন অসুস্থতা বা আকস্মিক সংকট দেখা দিলে ইসলাম সেখানে শিথিলতা প্রদর্শন করে। পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব প্রদান করেন না (সূরা আল-বাকারা, ২:২৮৬)। কিন্তু যখন কেউ জেনেশুনে সচেতনভাবে চালাকি করে নিজের অর্পিত দায়িত্ব এড়িয়ে যায় এবং কেবল সুবিধা গ্রহণে কৌশলী হয়ে ওঠে, তখন তা একটি গভীর নৈতিক সংকটে রূপ নেয়। এই ধরনের মানুষ সাময়িকভাবে লাভবান হলেও দীর্ঘমেয়াদে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। সমাজে মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা যা একবার নষ্ট হলে বাহ্যিক সমস্ত সাফল্য অর্থহীন হয়ে পড়ে। আন্তরিকতা, জবাবদিহিতা এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই কেবল ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি অর্জন সম্ভব।

banner
Link copied!