ইউরোভিশন গান প্রতিযোগিতার ৭০তম আসর আগামী ১৬ মে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে এই মাইলফলক আসরটি উদযাপনের চেয়ে বেশি বিতর্ক এবং উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। ইসরায়েলের অংশগ্রহণের প্রতিবাদে আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, স্লোভেনিয়া, স্পেন এবং আইসল্যান্ড ইতিমধ্যে এই আসর বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। গাজায় চলমান যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক অভিযানকে এই সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে দেশগুলো। গত বছর সুইজারল্যান্ডের বাসেলে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় অস্ট্রিয়ার শিল্পী জেজে জয়লাভ করায় এ বছর ভিয়েনা এই অনুষ্ঠানের আয়োজক শহর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।
এবারের আসরে ইসরায়েলের প্রতিনিধিত্ব করছেন তরুণ পপ শিল্পী নোয়াম বেত্তান। তিনি ‘মিশেল’ শিরোনামের একটি গান পরিবেশন করবেন বলে জানা গেছে। তবে এই অংশগ্রহণ নিয়ে খোদ ইউরোপেই ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের সম্প্রচার সংস্থা অ্যাভোট্রোস (AVROTROS) অভিযোগ করেছে যে ইসরায়েল গত আসরেও অন্যায্যভাবে হস্তক্ষেপ করেছে এবং যুদ্ধের সময় তারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন করেছে। সংস্থাটির মতে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের সাথে একই মঞ্চে অংশগ্রহণ করা তাদের মৌলিক জনস্বার্থ ও মূল্যবোধের পরিপন্থী। একইভাবে আয়ারল্যান্ডের সম্প্রচারকারী সংস্থা আরটিই (RTE) গাজায় ভয়াবহ মানবিক সংকটের কথা উল্লেখ করে প্রতিযোগিতায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
ইউরোভিশনের আয়োজক সংস্থা ইউরোপীয় ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন (ইবিইউ) এই প্রতিযোগিতাকে একটি অ-রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে দাবি করলেও সমালোচকরা একে দ্বিমুখী নীতি হিসেবে দেখছেন। ইতিমধ্যে ১ হাজারেরও বেশি সংগীতশিল্পী এবং সংস্কৃতিকর্মী একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন যেখানে ইউরোভিশন বর্জনের ডাক দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়াকে যেখানে এই প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেখানে গাজায় ৭২ হাজার ৭৪০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর পরও ইসরায়েলকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে যা সম্পূর্ণ বৈষম্যমূলক।
ভিয়েনার পর্যটন ও নিরাপত্তা বিভাগ এই আসরকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সতর্কতা অবলম্বন করেছে। স্লোভেনিয়া এবং স্পেনের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থাগুলোও তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে যে ২০ হাজার শিশুর মৃত্যু এবং গাজার পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নিয়ে তারা এই ‘নিরপেক্ষ’ সাংস্কৃতিক আয়োজনে থাকতে পারছে না। আইসল্যান্ডের সম্প্রচার সংস্থা আরইউভি (RUV) জানিয়েছে যে তাদের দেশে জনমতের চাপে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারণ ইসরায়েলের উপস্থিতিতে কোনোভাবেই একটি উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব নয়।
ইউরোভিশনের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় ১৯৫৬ সালে শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতায় ইসরায়েল প্রথম ইউরোপের বাইরের দেশ হিসেবে ১৯৭৩ সালে অংশগ্রহণ করেছিল। বর্তমানে ৩৫টি দেশের শিল্পীরা ভিয়েনায় উপস্থিত হলেও পাঁচটি প্রভাবশালী দেশের অনুপস্থিতি প্রতিযোগিতার রং কিছুটা হলেও ফিকে করে দিয়েছে। যদিও ইবিইউ তাদের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে তবে ভিয়েনার রাজপথে প্রতিবাদী বিক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক মহলের চাপ প্রতিযোগিতাটির ৭০তম বর্ষপূর্তিকে এক ধরনের কূটনৈতিক যুদ্ধের ময়দানে পরিণত করেছে। আগামী ১৬ মে চূড়ান্ত পর্বের আগে এই পরিস্থিতি আরও কতদূর গড়ায় তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল তুঙ্গে।
