মানুষ স্বভাবতই তার জীবনের ব্যর্থতা বা কষ্টের জন্য ভাগ্যকে দায়ী করতে পছন্দ করে। কোনো কাজে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেলে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বা নিয়তির ওপর দোষ চাপানো একটি অতি সাধারণ মানবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু ইসলাম ভাগ্য এবং মানুষের নিজস্ব কর্মপ্রচেষ্টার মধ্যে একটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত ভারসাম্য স্থাপন করেছে। বাংলাদেশের সম্প্রচার মাধ্যম নিউজ২৪-এর একটি প্রতিবেদনে সম্প্রতি এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, যেখানে মানুষের নিজের জীবন বদলানোর ক্ষমতা ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ গভীরভাবে তুলে ধরা হয়। এই আলোচনায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, মানুষের ভাগ্য সম্পূর্ণ পূর্বনির্ধারিত একটি স্থির রেখা নয়; বরং মানুষের বাস্তব পদক্ষেপ এখানে একটি বড় ভূমিকা পালন করে।
কুরআনের সূরা আর-রাদ-এর ১১ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেরাই নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। এই আয়াতটি ইসলামের অন্যতম মৌলিক একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক আইন প্রতিষ্ঠা করে। এর সহজ অর্থ হলো, স্রষ্টা মানুষকে চিন্তাশক্তি, বুদ্ধি এবং কাজ করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। সেই স্বাধীনতার সঠিক ব্যবহার ছাড়া জীবনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা অবাস্তব। বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীর আল-বাগাভীতে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যখন কোনো সম্প্রদায় তাদের নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করে এবং নেতিবাচক বা অবাধ্যতার পথে পা বাড়ায়, তখন আল্লাহ তাদের ওপর থেকে তাঁর রহমত তুলে নেন। অর্থাৎ, পরিবর্তনের চাবিকাঠি মানুষের নিজের হাতেই দেওয়া হয়েছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে এই নীতির অত্যন্ত বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়। ওহুদের যুদ্ধের ময়দানে মুসলিম বাহিনীর একটি কৌশলগত ভুলের কারণে তাদের চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। পাহাড়ের ওপর মোতায়েন করা তীরন্দাজরা যখন সামরিক নির্দেশ অমান্য করে তাদের নির্ধারিত অবস্থান থেকে সরে এসেছিলেন, তখন সেই একটি কাজের কারণে পুরো যুদ্ধের পরিস্থিতি বদলে গিয়েছিল। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, মানুষের নেওয়া প্রতিটি বাস্তব পদক্ষেপের সুনির্দিষ্ট ফলাফল রয়েছে। ঐশী সাহায্য তখনই আসে যখন মানুষ নিয়ম মেনে নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে। নিজের দায়িত্ব অবহেলা করে কেবল অলৌকিক সাহায্যের অপেক্ষায় বসে থাকা ইসলামের মূল চেতনার পরিপন্থী।
এই বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত স্তরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য। সহীহ আল-বুখারীর একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, সমাজে পুণ্যবান মানুষ থাকা সত্ত্বেও কি সমাজ ধ্বংস হতে পারে। উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন যে, যখন সমাজে অন্যায়, পাপাচার ও দুর্নীতি বেড়ে যায়, তখন ধ্বংস নেমে আসতে পারে। এই হাদিসটি স্পষ্ট করে দেয় যে, সমাজের ভালো মানুষগুলো যদি নিষ্ক্রিয় থাকে এবং খারাপ কাজের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তবে পুরো সম্প্রদায়কে তার পরিণতি ভোগ করতে হয়। অন্যায়ের সামনে নিষ্ক্রিয়তা নিজেই একটি নেতিবাচক কাজ, যা একটি জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
বাস্তব জীবনের উদাহরণের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। একজন কৃষক যদি জমিতে সঠিক সময়ে বীজ বপন না করেন, নিয়মিত সেচ না দেন এবং সার প্রয়োগের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা রক্ষা না করেন, তবে তিনি কখনোই ভালো ফলন আশা করতে পারেন না। লটকন বা অন্য যেকোনো অর্থকরী ফসল উৎপাদনের জন্য যেমন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও কৃষকের নিরলস পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়, তেমনি জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে সফল হতে হলে পরিশ্রম অপরিহার্য। একইভাবে, একজন খেলোয়াড় যদি কোনো বড় টুর্নামেন্ট বা ক্রিকেট লিগের আগে কঠোর অনুশীলন না করেন, তবে কেবল ভাগ্যের জোরে তিনি মাঠে ভালো পারফর্ম করতে পারবেন না। মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতিই মূলত ভাগ্যের দরজা খুলে দেয়।
নিউজ২৪-এর ওই প্রতিবেদনে এমন কিছু প্রাত্যহিক জীবনের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে যা সবার জন্য শিক্ষণীয়। যেমন ধরুন, একজন শিক্ষার্থী যিনি পরীক্ষায় ক্রমাগত খারাপ ফলাফল করছেন। তিনি যদি কেবল নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করে বসে থাকেন, তবে তার ফলাফলে কোনো পরিবর্তন আসবে না। কিন্তু তিনি যখন নিজের পড়ার সময়সূচি পরিবর্তন করবেন, রুটিন মেনে চলবেন এবং শিক্ষকদের পরামর্শ নিয়ে দুর্বল দিকগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করবেন, তখন তার সফল হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যাবে। ঠিক একইভাবে, একজন ব্যবসায়ী যিনি বারবার লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন, তাকেও তার ব্যবসায়িক কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন পথে এগোলেই কেবল তার ব্যবসার মোড় ঘুরতে পারে।
ইসলামে ভাগ্যের প্রতি বিশ্বাস বা তাকদিরের ধারণাটি মানুষকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য নয়, বরং চরম হতাশা থেকে মুক্ত রাখার জন্য দেওয়া হয়েছে। যখন একজন মানুষ তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পরও ব্যর্থ হন, তখন তিনি এই ভেবে সান্ত্বনা পান যে এটিই হয়তো বৃহত্তর কোনো পরিকল্পনার অংশ ছিল। কিন্তু চেষ্টা শুরু করার আগেই ভাগ্যের দোহাই দিয়ে বসে থাকা সম্পূর্ণ অনুচিত। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, মানুষের কাজ হলো কারণ বা উপায় সৃষ্টি করা, আর ফলাফলের জন্য স্রষ্টার ওপর নির্ভর করা। একে আরবি পরিভাষায় `তাওয়াক্কুল` বলা হয়। একটি উটের রশি ভালোভাবে বেঁধে তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করার যে বিখ্যাত নববি নির্দেশনা রয়েছে, তা এই কর্মপ্রচেষ্টা ও বিশ্বাসের নিখুঁত ভারসাম্যকেই প্রমাণ করে।
ব্যক্তিগত সফলতার বাইরেও, এই সক্রিয় মানসিকতা একটি নিরবচ্ছিন্ন শেখার পরিবেশ তৈরি করে। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে তাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল নির্ধারণ করে, তখন তারা তাদের অভ্যাসের বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়। তারা নিজেদের পরিস্থিতির শিকার হিসেবে না দেখে, নিজেদের ভবিষ্যতের কারিগর হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। পেশাগত জীবনে উন্নতি করা হোক বা পারিবারিক সম্পর্ক দৃঢ় করা হোক, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের দায়িত্ববোধকে স্বীকার করা অত্যন্ত জরুরি। নিজের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সংশোধনের জন্য ক্রমাগত কাজ করে যাওয়াই হলো একজন বুদ্ধিমান মানুষের বৈশিষ্ট্য।
বর্তমান সময়ের তরুণ প্রজন্মের জন্য এই শিক্ষাটি সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। চারপাশের জগৎ অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। এই অবস্থায় কেবল শর্টকাট বা ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে বড় কোনো অর্জন সম্ভব নয়। নিজের দক্ষতা বাড়ানো, মানসিক স্থিরতা বজায় রাখা এবং লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থাকা প্রয়োজন। আল্লাহ মানুষকে যে বিবেক ও বুদ্ধিমত্তা দিয়েছেন, তা কাজে লাগানোই হলো ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর প্রথম পদক্ষেপ। ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ মূলত মানুষের নিজের হাতেই দেওয়া হয়েছে। মানুষ যখন দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সামনে এগোতে শুরু করে, তখন পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিও তার অনুকূলে আসতে শুরু করে। জীবন বদলানোর এই কঠিন কিন্তু সম্ভবপর দায়িত্বটি প্রতিটি মানুষের একান্তই নিজস্ব।
