মানুষের জীবন কখনোই একটি সরল রেখায় চলে না। আমরা প্রায়শই নিজেদের জীবন, ক্যারিয়ার বা পরিবার নিয়ে নিখুঁত কিছু ছক কষে থাকি। কবে কী করব, কীভাবে সফল হব, তার একটি নির্দিষ্ট মানচিত্র আমাদের মনের ভেতর আঁকা থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক সময়ই আমাদের সেই সযত্নে সাজানো পরিকল্পনাগুলো চোখের সামনে ধসে পড়ে। তখন মনে এক গভীর শূন্যতা আর হতাশা ভর করে। চারপাশের পৃথিবীটা মনে হয় থমকে গেছে। ঠিক এমন অন্ধকার মুহূর্তেই ইসলাম আমাদের একটি অসামান্য দর্শনের কথা মনে করিয়ে দেয়। আর তা হলো, মানুষের পরিকল্পনার চেয়ে আল্লাহর প্ল্যান সবসময় অনেক বেশি নিখুঁত এবং কল্যাণকর।
আমাদের সীমিত দৃষ্টি দিয়ে আমরা কেবল বর্তমানের কষ্টটুকু দেখতে পাই। একটি চাকরি হারানো, ব্যবসায় লোকসান, প্রিয়জনের বিদায় বা কোনো কাঙ্ক্ষিত সুযোগ হাতছাড়া হওয়াকে আমরা জীবনের শেষ বলে ধরে নিই। কিন্তু যিনি পুরো মহাবিশ্বের স্রষ্টা, তিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবকিছুই সমানভাবে জানেন। কোরআনে খুব স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এমন অনেক কিছু আছে যা মানুষ অপছন্দ করে, অথচ তা তার জন্য কল্যাণকর। আবার এমন অনেক কিছু মানুষ ভালোবাসে, যা আসলে তার জন্য ক্ষতিকর (সূরা আল-বাকারা, ২:২১৬)। এই একটি আয়াত মানুষের জীবনের সব না-পাওয়ার হিসাব মিলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আমাদের কাছে যা বঞ্চনা মনে হয়, মহান আল্লাহর কাছে তা হয়তো কোনো বড় বিপদ থেকে রক্ষার উপায়।
ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে এবং নবীদের জীবনের দিকে তাকালে আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনার অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। হযরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের ঘটনাটি এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। নিজের আপন ভাইয়েরা তাকে ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে একটি গভীর কূপে ফেলে দিয়েছিল। একজন কিশোরের জন্য এর চেয়ে ভয়ংকর ও হতাশাজনক পরিস্থিতি আর কী হতে পারে। কূপ থেকে উদ্ধার পেয়ে তিনি বিক্রি হলেন দাস হিসেবে। এরপর বিনা অপরাধে তাকে বছরের পর বছর কারাগারে কাটাতে হলো। সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় কেবল বঞ্চনা আর অবিচারের গল্প। কিন্তু এই প্রতিটি কষ্টকর পদক্ষেপ আসলে তাকে মিসরের ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে বসানোর জন্য আল্লাহর একটি সুনিপুণ পরিকল্পনার অংশ ছিল। যদি তিনি কূপে না পড়তেন, দাস না হতেন বা কারাগারে না যেতেন, তবে সেই দেশের বাদশাহর স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে পুরো জাতিকে দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বাঁচাতে পারতেন না।
এই প্রজ্ঞাটি বোঝার জন্য যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা হলো ধৈর্য বা সবর। ধৈর্য মানে কেবল হাত গুটিয়ে বসে থাকা বা নিয়তির ওপর দোষ চাপিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে ধৈর্য হলো একটি অত্যন্ত সক্রিয় মানসিক অবস্থা। এর অর্থ হলো বিপদের সময় ভেঙে না পড়ে আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, একজন মুমিনের বিষয়টি সত্যিই বিস্ময়কর, কারণ তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর (সহীহ মুসলিম, ২৯৯৯)। যখন সে আনন্দের কিছু পায় তখন সে শুকরিয়া আদায় করে, আর যখন কোনো বিপদে পড়ে তখন সে ধৈর্য ধারণ করে। এই তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতাই একজন মানুষকে চরম হতাশার মাঝেও মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়।
বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে হতাশা, বিষণ্ণতা এবং মানসিক উদ্বেগের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো জীবনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক অবাস্তব আকাঙ্ক্ষা। আমরা মেনে নিতে পারি না যে আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরেও কিছু ঘটতে পারে। যখনই পরিস্থিতি আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়, আমরা ভেঙে পড়ি। কিন্তু একজন প্রকৃত মুমিন জানেন যে তার জীবনের স্টিয়ারিং হুইল যিনি ধরে আছেন, তিনি পরম করুণাময়। সাময়িক কোনো ব্যর্থতা আসলে ব্যর্থতা নয়, বরং এটি একটি নতুন রাস্তার দিকনির্দেশনা মাত্র। হয়তো আল্লাহ আপনাকে এমন একটি জায়গা থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন যা আপনার জন্য ক্ষতিকর ছিল, এবং এমন কিছুর জন্য প্রস্তুত করছেন যা আপনার কল্পনার চেয়েও সুন্দর।
জীবনের পেছনের দিকের বিন্দুগুলো মেলালেই কেবল আমরা আল্লাহর পরিকল্পনার আসল সৌন্দর্য দেখতে পাই। দশ বছর আগের যে ঘটনাটি নিয়ে আপনি কেঁদে ভাসিয়েছিলেন, আজ হয়তো বুঝতে পারছেন সেই ঘটনাটি না ঘটলে আপনি আজকের এই অবস্থানে আসতে পারতেন না। মানুষের কাজ হলো সততার সাথে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাওয়া। ফলাফলের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে হবে। যখন আমরা বুঝতে শিখব যে প্রতিটি প্রত্যাখ্যান আসলে এক একটি ঐশ্বরিক সুরক্ষা, তখন জীবনের কোনো কষ্টই আর আমাদের ভেতর থেকে ভেঙে দিতে পারবে না। কারণ, আল্লাহর প্ল্যান সবসময় সেরা, আর সেই শ্রেষ্ঠত্ব উপলব্ধি করার একমাত্র চাবিকাঠি হলো অবিচল ধৈর্য।
