বুধবার, ০৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩

আল্লাহ কেন তার প্রিয় বান্দাদের বেশি পরীক্ষা নেন

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৬, ২০২৬, ০৮:৫৪ পিএম

আল্লাহ কেন তার প্রিয় বান্দাদের বেশি পরীক্ষা নেন

মানুষের সাধারণ একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা হলো জাগতিক আরাম-আয়েশকে স্রষ্টার সন্তুষ্টির মাপকাঠি হিসেবে ধরে নেওয়া। যখন কোনো সৎ, ধার্মিক এবং নীতিবান মানুষের জীবনে একের পর এক বিপর্যয় নেমে আসে, তখন অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, এত ভালো মানুষটির সাথে কেন এমন ঘটছে। সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, যারা স্রষ্টার অনুগত তারা সব ধরনের জাগতিক কষ্ট থেকে মুক্ত থাকবেন। কিন্তু ইসলামি জীবনদর্শন এই ধারণাটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মাত্রায় উপস্থাপন করে। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, পার্থিব জীবনের কষ্ট বা বিপদ সবসময় স্রষ্টার ক্রোধের লক্ষণ নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি তাঁর গভীর ভালোবাসা এবং বান্দাকে পরিশুদ্ধ করার একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া।

কুরআনের দিকে তাকালে বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। সূরা আল-বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সরাসরি ঘোষণা করেছেন যে, তিনি অবশ্যই মানুষকে ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে পরীক্ষা করবেন। একই আয়াতে চরম বিপদের মুহূর্তে যারা ধৈর্য ধারণ করে তাদের জন্য সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, বিপদ-আপদ মানুষের জীবনের একটি অবশ্যম্ভাবী অংশ। এটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং মানবজীবনের বৃহত্তর সিলেবাসের একটি পরিকল্পিত অধ্যায়। স্রষ্টা আগেই জানিয়ে দিয়েছেন যে পরীক্ষা আসবেই, আর সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার একমাত্র হাতিয়ার হলো ধৈর্য বা সবর।

এই পরীক্ষার পেছনের যৌক্তিকতা সম্পর্কে সূরা আল-আহযাব ও সূরা আল-আনকাবুতে গভীর বার্তা রয়েছে। সূরা আল-আনকাবুতের ২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ কি মনে করে যে ‍‍`আমরা ঈমান এনেছি‍‍` বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তাদের কোনো পরীক্ষা করা হবে না? বিষয়টি ঠিক সোনার খাদ বের করার প্রক্রিয়ার মতো। খাঁটি সোনা চিনতে হলে তাকে যেমন আগুনে পোড়াতে হয়, তেমনি একজন মানুষের বিশ্বাসের গভীরতা এবং স্রষ্টার প্রতি তার নির্ভরতা যাচাই করার জন্য বিপদের আগুন অপরিহার্য। অনুকূল পরিবেশে সবাই ভালো থাকতে পারে, কিন্তু চরম প্রতিকূলতার মাঝেও কে তার নীতি ও বিশ্বাসে অটল থাকে, মূলত সেটাই যাচাই করা হয়।

হাদিস শাস্ত্রের দিকে নজর দিলে এই ধারণার আরও বাস্তব ও কাঠামোগত ভিত্তি পাওয়া যায়। সহীহ আল-বুখারীর একটি বিখ্যাত বর্ণনায় বলা হয়েছে, আল্লাহ যার মঙ্গল চান, তাকে তিনি বিপদে ফেলেন। অন্য একটি হাদিসে নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন কারা হন? উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন যে, নবীরা সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হন। এরপর যারা নবীদের যত বেশি অনুসারী বা আধ্যাত্মিকভাবে যত উন্নত, তাদের পরীক্ষাও তত বেশি কঠিন হয়। এই হাদিসটি প্রচলিত সেই ধারণাকে ভেঙে দেয় যেখানে মনে করা হয় যে কেবল পাপীদেরই শাস্তি হিসেবে বিপদ দেওয়া হয়। বরং আধ্যাত্মিক জগতের নিয়মটি ঠিক উল্টো; যার বিশ্বাস যত মজবুত, তার পরীক্ষার মাত্রাও তত তীব্র।

বিপদ-আপদ মুমিনের জীবনে মূলত দুটি প্রধান কাজ করে। প্রথমত, এটি গুনাহ বা পাপ মোচনের একটি স্বয়ংক্রিয় মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, একজন মুসলিমের জীবনে যে ক্লান্তি, রোগ-ব্যাধি, শোক, কষ্ট বা উদ্বেগ আসে, এমনকি তার পায়ে যদি একটি কাঁটাও ফোটে, তবে তার বিনিময়ে আল্লাহ তার কিছু পাপ ক্ষমা করে দেন। অর্থাৎ, পার্থিব জীবনের এই ছোট ছোট কষ্টগুলো পরকালের হিসাবকে সহজ করে দেয়। এটি একজন মুমিনের জন্য স্রষ্টার এক বিশেষ দয়া, যেখানে বড় শাস্তির বদলে ছোট ছোট পরীক্ষার মাধ্যমে তাকে পরিশুদ্ধ করে নেওয়া হয়।

দ্বিতীয়ত, বিপদ-আপদের মাধ্যমে মানুষের আধ্যাত্মিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, কখনো কখনো স্রষ্টা তার কোনো বান্দার জন্য পরকালে এমন একটি উচ্চ মর্যাদা নির্ধারণ করে রাখেন, যা সে তার দৈনন্দিন স্বাভাবিক ইবাদত বা সৎকাজের মাধ্যমে অর্জন করতে সক্ষম হয় না। সেই নির্দিষ্ট মর্যাদায় পৌঁছানোর জন্য তখন তার জীবনে এমন কিছু কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, যা তাকে চরম ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে বাধ্য করে। এই ধৈর্যের বিনিময়ে সে তার নির্ধারিত সেই উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে যায়।

মানুষ স্বভাবতই আরামপ্রিয়। দীর্ঘমেয়াদী সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য অনেক সময় মানুষের ভেতরে অহংকার এবং আত্মকেন্দ্রিকতা তৈরি করে। মানুষ ভুলে যায় যে তার প্রতিটি নিঃশ্বাস অন্য এক সত্তার নিয়ন্ত্রণের অধীন। চরম বিপদ বা অসহায়ত্বের মুহূর্তগুলো মানুষের এই অহংকারের খোলস ভেঙে দেয়। তখন মানুষ তার নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে এবং সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় স্রষ্টার দিকে ফিরে আসে। মূলত, বিপদের ধাক্কা মানুষকে জাগতিক মোহের ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। এটি মনে করিয়ে দেয় যে এই পৃথিবী একটি অস্থায়ী পরীক্ষাকেন্দ্র মাত্র, মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য এটি নয়।

ইসলামি এই দর্শন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা বা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি অবিশ্বাস্য ঢাল হিসেবে কাজ করে। যখন একজন মানুষ বিশ্বাস করে যে তার জীবনের প্রতিটি কষ্ট, প্রতিটি বঞ্চনা বৃথা যাচ্ছে না, বরং এর পেছনে একটি মহৎ উদ্দেশ্য এবং বিশাল পুরস্কার অপেক্ষা করছে, তখন সে কখনোই চূড়ান্ত হতাশায় ভোগে না। সে তার জীবনের ট্র্যাজেডিগুলোকে ‍‍`কেন আমার সাথেই এমন হলো‍‍` এই দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে, ‍‍`এর মাধ্যমে আল্লাহ আমাকে কী শেখাতে চাইছেন‍‍` সেই দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করতে শেখে। চরম বিপর্যয়ের মুখেও ঘুরে দাঁড়ানোর এই যে অদম্য মানসিক শক্তি, এটাই মূলত বিপদ-আপদের প্রতি ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।

banner
Link copied!