বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রকৃত ন্যায়বিচার ও একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজের রূপরেখা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১১, ২০২৬, ১০:০৮ পিএম

প্রকৃত ন্যায়বিচার ও একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজের রূপরেখা

মানবসৃষ্ট কোনো বিচারব্যবস্থা বা আইন দিয়ে সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা পুরোপুরি সম্ভব নয়। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি ও স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে উঠে সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করতে হলে আত্মসমর্পণ করতে হয় মহান আল্লাহর বিধানের কাছে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণই পারে সমাজে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রশ্ন করা জরুরি, আমি কি আল্লাহর আইনের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছি, নাকি জাগতিক লোভ-মোহ আর স্বার্থের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছি। সমাজ যখন ন্যায়বিচার হারায়, তখনই সেখানে হানাহানি, মারামারি আর অস্থিরতার কালো ছায়া গ্রাস করে।

ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানবতার কল্যাণ, ন্যায়বিচার ও শান্তি নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমা লঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন (সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০)। এই নির্দেশনার আলোকে একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো ধর্ষণ, হত্যা, গুম, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, সুদ, ঘুষ, চাঁদাবাজি এবং সিন্ডিকেটের মতো সব ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। কারণ এসব অপরাধ শুধু আইন অমান্য করাই নয়, বরং সমাজের মানবিক ভিত্তি ও নিরাপত্তা ধ্বংস করে দেয়।

সমাজে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে একটি ইনসাফভিত্তিক বিচারব্যবস্থা অপরিহার্য। যাতে সব শ্রেণির মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান সমানভাবে সংরক্ষিত থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, হে বুদ্ধিমানগণ! হত্যার বদলে হত্যার (কিসাস) মধ্যেই তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে (সূরা আল-বাকারা, ২:১৭৯)। ইসলাম মানুষের জীবনের মর্যাদাকে অত্যন্ত উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল্লাহর কাছে একজন নিরপরাধ মানুষ হত্যার চেয়েও হালকা (সহীহ আল-বুখারী, ৬৮৬৩)। তবে ইসলাম কখনো আবেগনির্ভর বিচার বা মব ভায়োলেন্স সমর্থন করে না। অপরাধের উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যায়। রাজনৈতিক প্রভাব বা জনরোষের নামে বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ করা কাম্য নয়।

নারীর প্রকৃত মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিতে ইসলাম অত্যন্ত স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। ইসলাম নারীকে শিক্ষা, সম্পদ, ভরণপোষণ এবং নিরাপত্তার অধিকার প্রদান করেছে। আধুনিকতার নামে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা ইসলাম সমর্থন করে না। রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম (সহীহ আল-বুখারী, ৬০৩৫)। একই সঙ্গে সুদ, ঘুষ ও অর্থনৈতিক লুটপাটের বিরুদ্ধে ইসলাম কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বাজার সিন্ডিকেট, পণ্য মজুত এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৫)।

ন্যায়বিচার ও মানব কল্যাণের প্রশ্নে জাতি, বর্ণ বা ধর্মভেদে বৈষম্য করার কোনো সুযোগ নেই। সব মানুষই সমান মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রাখে। রাজনৈতিক স্বার্থে বিভাজন, দমনপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন ইসলামের শিক্ষা নয়। আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সে-ই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক তাকওয়াবান (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩)। পরিবার ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করে একটি সুস্থ ও নৈতিক সমাজ বিনির্মাণই ইসলামের মূল লক্ষ্য। অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয় রোধ করে সুস্থ ধারার সমাজ গড়াই মুমিনের দায়িত্ব।

banner
Link copied!