রবিবার, ১০ মে, ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩

ধ্বংসস্তূপে ফুটবল: গাজার অনাথ শিশুদের বাঁচার নতুন স্বপ্ন

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১০, ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম

ধ্বংসস্তূপে ফুটবল: গাজার অনাথ শিশুদের বাঁচার নতুন স্বপ্ন

গাজার উত্তর অঞ্চলের জাবালিয়া শরণার্থী ক্যাম্পের ১৬ বছর বয়সী কিশোর মোহাম্মদ ইয়াদ আজম এক সময় নিজেকে খুব আদুরে সন্তান বলে মনে করত। কিন্তু ২০২৪ সালের ১১ অক্টোবর একটি ইসরায়েলি বিমান হামলা তার জীবনকে চিরতরে বদলে দেয়। সেই সকালে কোনো সতর্কতা ছাড়াই তাদের বহুতল ভবনটির ওপর বোমা ফেলে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। ধসে পড়া কংক্রিটের স্তূপের নিচে প্রায় ১০ মিনিট চাপা পড়ে ছিল মোহাম্মদ। তার দাদী কোনোক্রমে তাকে টেনে বের করে আনেন। যখন জ্ঞান ফিরল মোহাম্মদ নিজেকে প্রতিবেশী একটি বাড়িতে ভেন্টিলেটরে আবিষ্কার করে। অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও সে হারিয়েছে তার বাবা, মা এবং দুই বড় ভাইকে। পরিবারের একমাত্র জীবিত পুরুষ সদস্য হিসেবে এখন কিশোর মোহাম্মদের কাঁধে তার বৃদ্ধা দাদীর দেখভালের গুরুভার।

বর্তমানে উত্তর গাজার শাতি শরণার্থী ক্যাম্পে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের ভিড়ে এক খুপড়ি ঘরে বসবাস করছে মোহাম্মদ। জীবনের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা এবং স্বজন হারানোর ট্রমা থেকে বাঁচতে তার একমাত্র অবলম্বন এখন ফুটবল। যুদ্ধের আগে সে ছিল জাবালিয়ার বিখ্যাত খদমাত জাবালিয়া ফুটবল ক্লাবের এক উদীয়মান খেলোয়াড়। কিন্তু ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসনে তার প্রিয় ক্লাবটি এখন ধ্বংসস্তূপ। মাঠগুলো বোমা মেরে গর্ত করে ফেলা হয়েছে এবং তার দলের অনেক সতীর্থ এখন আর বেঁচে নেই। তবুও মোহাম্মদের মতো কিশোরদের মানসিক শক্তি জোগাতে ফিলিস্তিনি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (পিএফএ) সম্প্রতি ২০০৯ সালে জন্ম নেওয়া কিশোরদের নিয়ে একটি বিশেষ টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছে। গাজার হাতেগোনা যে কয়েকটি মাঠ এখনো খেলার উপযোগী আছে সেখানেই চলছে এই লড়াই।

ফুটবল খেলা মোহাম্মদের জন্য কেবল একটি বিনোদন নয় বরং এটি তার বেঁচে থাকার একটি মনস্তাত্ত্বিক মাধ্যম। সে জানায় যে মাঠে যখন সে বল নিয়ে দৌড়ায় তখন তার মনের সব নেতিবাচক শক্তি এবং ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। তবে মাঠের পরিবেশ তাকে মাঝে মাঝে ভীষণ আবেগপ্রবণ করে তোলে। টুর্নামেন্টের অন্য খেলোয়াড়দের বাবা বা ভাইরা যখন মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে হাততালি দেয় বা চিৎকার করে উৎসাহ দেয় তখন মোহাম্মদ তার হারানো পরিবারকে খুব বেশি মিস করে। তার ভাষায় সমুদ্রের মাছেরা যেমন সমুদ্রকে মিস করে সেও তার বাবা-মা আর ভাইদের ঠিক ততোটাই মিস করছে। মোহাম্মদের এই বুকফাটা আর্তনাদ আজ গাজার প্রতিটি কোণায় ধ্বনিত হচ্ছে।

ফিলিস্তিনি ক্রীড়া জগতের ওপর ইসরায়েলি আঘাতের চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। পিএফএ-র দক্ষিণ অঞ্চলের মিডিয়া প্রধান মুস্তফা সিয়াম জানিয়েছেন যে গাজার ক্রীড়া অবকাঠামো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। গত আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা হামলায় ক্রীড়া খাতের সঙ্গে জড়িত ১,১১৩ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৬০ জনেরও বেশি ছিলেন পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড়, কোচ এবং কর্মকর্তা। গাজার উত্তরের বেইত হানুন থেকে শুরু করে দক্ষিণের রাফাহ পর্যন্ত অবস্থিত মোট ৫৬টি ফুটবল ক্লাবের সবগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি মোহাম্মদের প্রিয় খদমাত জাবালিয়া ক্লাবটিকে এক পর্যায়ে ইসরায়েলি বাহিনী অস্থায়ী আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।

গাজায় এখন বড় কোনো স্টেডিয়াম আস্ত নেই। হয় সেগুলো বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত হয়েছে নতুবা সেখানে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো তাঁবু গেড়ে আশ্রয় নিয়েছে। পিএফএ বর্তমানে মাত্র তিনটি ছোট পিচে টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে পারছে—গাজা সিটির প্যালেস্টাইন স্টেডিয়াম, খদমাত নুসেইরাত এবং ইত্তিহাদ শাবাব দেইর আল-বালাহ। কিন্তু এই মাঠগুলোতে পৌঁছানোও ছোট ছোট খেলোয়াড়দের জন্য জীবন বাজি রাখার মতো এক যুদ্ধ। মোহাম্মদ জানায় যে তাকে ধ্বংসস্তূপ এবং তাঁবুর সারির ভেতর দিয়ে প্রায় ৩-৪ কিলোমিটার পথ হেঁটে মাঠে আসতে হয়। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতেই তারা মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তবু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা তাদের প্রতিদিন এই বিপদসংকুল পথে টেনে আনে।

গাজার এই অনাথ শিশুদের ফুটবল খেলা বিশ্ববাসীর জন্য এক শক্তিশালী বার্তা। যেখানে জীবন প্রতি মুহূর্তে হুমকির মুখে সেখানে ফুটবল হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের এক ভাষা। মোস্তফা সিয়ামের মতে মোহাম্মদ আজ গাজার সেই হাজার হাজার প্রতিভাবান শিশুর প্রতিনিধি যারা তাদের পরিবার, ক্লাব এবং শৈশব হারিয়েছে। কিন্তু তাদের এই অদম্য স্পৃহা প্রমাণ করে যে গাজার ফুটবল কখনও শেষ হয়ে যাবে না। ধ্বংসস্তূপের ওপর গোল করার প্রতিটি মুহূর্ত তাদের মনে করিয়ে দেয় যে তারা এখনো বেঁচে আছে এবং তারা একদিন আবার তাদের হারানো অধিকার ফিরে পাবে। গাজার প্রতিটি গোল আজ কেবল একটি পয়েন্ট নয় বরং এটি বর্বরতার বিরুদ্ধে মানবতার এক জয়ের হুঙ্কার।

banner
Link copied!