গাজায় তিন বছর ধরে চলা অব্যাহত বোমাবর্ষণ ও সামরিক আগ্রাসনের মুখে চরম ব্যক্তিগত শোক বুকে চেপে বেঁচে থাকার এক মর্মস্পর্শী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ৩৪ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি নারী নিসরিন তৌমান। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে তিনি মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে হারিয়েছেন তাঁর দুই স্বামী ও দুই অবোধ শিশুকে। মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের পরিচিত বাড়িটিতে একসময় তাঁর স্বামী সামি এবং পাঁচ ও দুই বছর বয়সী দুই সন্তান মাহমুদ ও লাইসকে নিয়ে সাজানো সংসার ছিল। সেই চেনা অস্তিত্ব নিমেষেই বিলীন হয়ে যায় সামরিক বিমান ও ড্রোন হামলায়।
৮ জুন ২০২৪ ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার দিন।
খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুত আত্মীয়দের দেখে সেদিনই ঘরে ফিরেছিলেন নিসরিন। শিশুরা বাড়ির সামনের গলিতে খেলছিল এবং দোতলায় স্বামীর সাথে কথা বলার সময় হঠাৎ ভারী গোলাগুলি ও বোমাবর্ষণের শব্দ শুরু হয়। আশপাশে থাকা পরিবারের ২৫ জন সদস্যকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে নিসরিনের স্বামী সামি বাইরে ছুটে যান। আকাশে উড়তে থাকা একটি কোয়াডকপ্টার ড্রোনের ছোড়া গুলি সরাসরি সামির মাথায় আঘাত হানে। এর কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দোতলা ভবনটিকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে ভারী ক্ষেপণাস্ত্র ফেলা হয়।
ঘন ধুলোবালি আর ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে স্বজনদের আর্তনাদ ভেসে আসতে থাকে।
মাটির ওপর নিথর পড়ে থাকা নিজের দুই সন্তানের নিস্পন্দ দেহ আঁকড়ে ধরে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরের ভেতর দুই ঘণ্টা কাটিয়ে দেন নিসরিন। রেড ক্রসের মাধ্যমে পরবর্তীতে আহত ও নিহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। জাতিসংঘের তথ্যমতে, সেদিন মাত্র চার ঘণ্টার অভিযানে ৮৯টি আবাসিক ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক হিসাবে ওই এক দিনেই ২৭৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং প্রায় সাতশত মানুষ গুরুতর আহত হন। নিসরিনের পরিবারের মোট ১৮ জন সদস্য প্রাণ হারান, যার মধ্যে তাঁর বোন সাবরিন এবং পরিবারের অন্য সদস্যরাও ছিলেন।
পরবর্তীকালে আল-মাওয়াসির তাঁবুতে আশ্রয় নিয়ে মানসিক ট্রমার মুখোমুখি হন তিনি। নিহত বোনের রেখে যাওয়া চার এতিম শিশুর সুরক্ষায় তাদের বাবার সাথে নিসরিনের দ্বিতীয় বিয়ে হয়। রোমান্টিক কোনো অনুভূতির বদলে একে অপরের অপূরণীয় ক্ষতিপূরণ ও এতিম শিশুদের মাতৃস্নেহ দেওয়ার তাগিদ থেকেই এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে এবং মৃত সন্তানদের স্মৃতি ভুলতে মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি আবারও সন্তান ধারণের সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু আট মাস না পেরোতেই ২০২৫ সালের ৮ জুলাই নুসেইরাতের আল-আওদা হাসপাতালের কাছে বিমান হামলায় নিহত হন তাঁর দ্বিতীয় স্বামী মোহাম্মদ।
অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আবারও স্বামী হারিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েন নিসরিন। মোহাম্মদের মৃত্যুর চার মাস পর জন্ম নেয় তাঁদের একমাত্র কন্যাসন্তান সিদরা। ফুটফুটে এই শিশুটি বর্তমানে তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হলেও নিসরিন স্পষ্ট বুঝতে পারেন, তাঁর সন্তান কোনোদিন বাবার মুখ দেখতে পারবে না।
নিজের পরিবার নিয়ে বর্তমানে নিসরিন গাজায় বসবাস করছেন এবং শোককে সঙ্গে নিয়েই একমাত্র কন্যা সিদরাকে বড় করে তুলছেন।
