সোমবার, ০১ জুন, ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

মোদির কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে নতুন জোটে পাকিস্তান

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৩১, ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম

মোদির কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে নতুন জোটে পাকিস্তান

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিবেশ রাষ্ট্র পাকিস্তানকে সম্পূর্ণ একঘরে করার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ এক দশকের সুনির্দিষ্ট পররাষ্ট্রনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার সাম্প্রতিক এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে যে, বিশ্বমঞ্চে ইসলামাবাদকে পুরোপুরি কোণঠাসা করার জন্য নয়াদিল্লির নেওয়া বহুমুখী কৌশলগত পরিকল্পনাগুলো কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৪ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর এবং বিশেষ করে ২০১৬ সালের উরি সেনা ছাউনিতে আত্মঘাতী হামলার পর থেকে শুরু হওয়া মোদির কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন ভারতের নিজের জন্যই উল্টো ফল বা বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে পাকিস্তান বিশ্ব পরিমণ্ডল থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে উল্টো নতুন নতুন বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

নয়াদিল্লির নেওয়া এই কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল তিনটি সুনির্দিষ্ট ফ্রন্টে কাজ করা, যার প্রথমটি ছিল আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে পাকিস্তানকে একটি সন্ত্রাসবাদে মদদদাতা রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে সম্পূর্ণ একাকী করে ফেলা। দ্বিতীয়ত, বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর কাছে ইসলামাবাদের গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা এবং তৃতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কূটনৈতিক কাঠামোয় ভারতের একক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা। এই নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ভারত জাতিসংঘ, জি-টোয়েন্টি এবং সার্কের মতো প্রভাবশালী বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করে। এর ফলে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্কের কার্যক্রম কার্যত সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে, কারণ ২০১৬ সালের পর ভারত ইসলামাবাদে নির্ধারিত শীর্ষ সম্মেলন বয়কট করলে এই অঞ্চলের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও কূটনীতি বড় ধরনের স্থবিরতার মুখে পড়ে।

আল-জাজিরার কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোদির কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে চীন ও পাকিস্তানের মধ্যকার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের অভূতপূর্ব গভীরতা বৃদ্ধি। বেইজিংয়ের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপেক (CPEC) প্রকল্প পাকিস্তানের ধসে পড়া অর্থনীতিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের দুয়ার খুলে দেয়। এই মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো, বিদ্যুৎ খাত এবং গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে, যা ইসলামাবাদের জন্য যেকোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে চীনের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য কূটনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। এর ফলে পরাশক্তি চীনের ভেটো ক্ষমতার সুবিধা নিয়ে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত রাখতে পেরেছে।

একই সঙ্গে বৈশ্বিক পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে পাকিস্তানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা বা বর্জন করতে পারেনি। আফগানিস্তানের বর্তমান জটিল পরিস্থিতি, মধ্য এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বার্থে ওয়াশিংটনকে সবসময় ইসলামাবাদের সঙ্গে একটি কার্যকরী কূটনৈতিক যোগসূত্র বজায় রাখতে হয়েছে। আল-জাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতি সবসময়ই একটি দ্বিমুখী ভারসাম্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে, যেখানে ভারতকে একটি প্রধান কৌশলগত অংশীদার হিসেবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হলেও আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে পাকিস্তানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার ফরাসি বা ভারতীয় চাপকে তারা কখনোই বাস্তবায়ন করেনি।

এই জটিল আন্তর্জাতিক ভারসাম্যের সুযোগ নিয়ে পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজার-ভিত্তিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও বেশি জোরদার ও আধুনিক করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারের মতো অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের অংশীদারিত্ব কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি বিশাল রেমিট্যান্স প্রবাহের একটি শক্তিশালী উৎসে পরিণত হয়েছে। বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত থাকায় এই অর্থনৈতিক সংযোগ দেশটির ভঙ্গুর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে টিকিয়ে রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই তিনটি বড় আন্তর্জাতিক সংযোগই পাকিস্তানকে একটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা দেউলিয়া রাষ্ট্র হওয়া থেকে রক্ষা করেছে এবং তাদের নতুন কূটনৈতিক স্পেস তৈরি করতে সাহায্য করেছে।

ভারতের এই একঘরে করার কৌশল ব্যর্থ হওয়ার আরেকটি প্রধান কারণ হলো সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন, যা এখন আর কোনো এককেন্দ্রিক ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হচ্ছে না। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত একটি বহুকেন্দ্রিক বা মাল্টিপোলার ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আদর্শের চেয়ে অনেক বেশি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের পক্ষে অন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা এখন প্রায় অসম্ভব একটি অলীক কল্পনামাত্র। এই বাস্তবতায় পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট, তীব্র রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও বিশ্ব রাজনীতিতে তাদের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব ধরে রাখতে পেরেছে, যা মোদির কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদী আইসোলেশন পলিসিকে কার্যত পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ও ব্যর্থ করে দিয়েছে।

banner
Link copied!