ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার ঠিক চব্বিশ ঘণ্টার মাথায় দলটির আরেক প্রভাবশালী শীর্ষ নেতা ও লোকসভা সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর এক ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। রবিবার পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার চণ্ডীতলা এলাকায় নিজ নির্বাচনী এলাকায় সাধারণ মানুষের সাথে জনসংযোগ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি চলাকালীন তিনি এই মারাত্মক সহিংসতার শিকার হন। ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির বিশেষ প্রতিবেদন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই খবর নিশ্চিত করেছে। এই বর্বরোচিত হামলার পেছনে উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জানতা পার্টির (বিজেপি) নেতাকর্মীদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে তৃণমূলের পক্ষ থেকে জোরালো অভিযোগ তোলা হয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত এবং এনডিটিভির অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্রকাশ্য দিবালোকে একদল উত্তেজিত জনতা চণ্ডীতলা এলাকায় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর আচমকা চড়াও হয়। একপর্যায়ে মাথায় মারাত্মক আঘাত লাগার পর তিনি তীব্র যন্ত্রণায় মাথা চেপে ধরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সে সময় তাঁর মাথা থেকে অনবরত রক্ত গড়িয়ে পড়তে দেখা যায় এবং স্থানীয় পুলিশ সদস্যরা কোনো রকমে উত্তেজিত ভিড় নিয়ন্ত্রণ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। ঘটনার সময় উপস্থিত ভিড়ের মধ্য থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে "চোর, চোর" স্লোগান উগরে দেওয়া হচ্ছিল, যা এই রাজনৈতিক সহিংসতার পেছনে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ও স্থানীয় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে ধারণা করছেন মাঠপর্যায়ের বিশ্লেষকরা।
এই বর্বরোচিত হামলার পর রক্তাক্ত অবস্থায় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্থানীয় একটি চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ব্যান্ডেজ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে মাথায় সাদা কাপড় বাঁধা অবস্থায় তিনি তাঁর স্থানীয় দলীয় সমর্থক ও কর্মীদের উদ্দেশ্যে এক সংক্ষিপ্ত আবেগঘন বক্তব্য প্রদান করেন। বক্তব্যে তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে, বিজেপির উগ্র কর্মী-সম্পর্কের লোকেরা অত্যন্ত পরিকল্পিত উপায়ে তাঁর ওপর এই প্রতিশোধমূলক ও প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে। তবে তৃণমূলের এই গুরুতর ও প্রকাশ্য অভিযোগের বিপরীতে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কেন্দ্রীয় বা রাজ্য নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া বা সুনির্দিষ্ট বিবৃতি প্রদান করা হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গের এই চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা মূলত আগের দিন শনিবার শুরু হয়, যখন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর এক আকস্মিক হামলার ঘটনা ঘটে। পর পর দুই দিন দলটির দুই শীর্ষ নেতার ওপর এমন ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক মেরুকরণকে বিশ্বমঞ্চে পুনরায় সামনে এনেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্ররা দাবি করেছেন যে, আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক ময়দানে নিজেদের পরাজয় নিশ্চিত জেনেই বিরোধী দলগুলো এখন পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা ও রক্তপাতের পথ বেছে নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি যখন অন্যান্য বৈশ্বিক ঘটনায় নিবদ্ধ, তখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের এই কৌশলগত রাজ্যে রাজনৈতিক হানাহানি দিন দিন এক চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। মেহরৌলি বা দিল্লির অন্যান্য অঞ্চলের সাম্প্রতিক ঘটনার মতো এখানেও রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। চণ্ডীতলা থানার পুলিশ এই ঘটনার পর একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে। তবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করা হলে এই ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা থামানো প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
