মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩

হরমুজ প্রণালী চালু রাখতে সম্মত হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ২৩, ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম

হরমুজ প্রণালী চালু রাখতে সম্মত হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সুইজারল্যান্ডে চলমান শান্তি আলোচনার প্রথম দিনে ৬০ দিনের জন্য জ্বালানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িক প্রত্যাহারের বিষয়ে একমত হয়েছে বলে মঙ্গলবার আল জাজিরা জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটানো এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটন থেকে এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে ইরান যদি এই চুক্তির শর্তগুলো সঠিকভাবে মেনে না চলে তবে তিনি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। গত সপ্তাহে উভয় দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের ওপর ভিত্তি করে এই সরাসরি সংলাপ শুরু হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক রিসোর্টে কাতার এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই নিবিড় কূটনৈতিক আলোচনা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

এই আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোর মধ্যে একটি হলো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সচল রাখা। বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে উভয় পক্ষ একটি বিশেষ যোগাযোগ লাইন স্থাপন করেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল। শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে ইরানের এই আকস্মিক পদক্ষেপের কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তীব্র ধাক্কা লেগেছিল এবং তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

ঐতিহাসিক এই শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য উৎপাদনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িক স্থগিত করার সাধারণ লাইসেন্স জারি করেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে সুইজারল্যান্ডের এই বৈঠকটি একটি স্থায়ী এবং সফল শান্তি চুক্তির জন্য অত্যন্ত চমৎকার একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এই ইতিবাচক অগ্রগতির মাঝেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গভীর মতভেদ রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র বিতর্ক চলছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো মার্কিন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব বাজারে দীর্ঘমেয়াদে কতটা স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হবে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় তেহরান নতুন কোনো শর্ত বা পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনো নতুন প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেনি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের ইরানে প্রবেশের বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়নি। ইরানের বর্তমান আইন এবং দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের অনুমোদন সাপেক্ষেই কেবল এই বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কাতার ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীরা একটি যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী ও চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য উভয় দেশ একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে সম্মত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখার ওপর এই চুক্তির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে। ওমান সফররত ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালাবাফ জানিয়েছেন যে হরমুজ প্রণালীতে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এই চুক্তির ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে এবং এর ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের মতো আমদানিকারক দেশগুলোর অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলা মার্কিন ও ইরানি কূটনৈতিক সংকটের ইতিহাসে এই আলোচনাকে একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

banner
Link copied!