ইউরোপের ৯টি দেশ এবং ইউক্রেন সোমবার প্যারিসে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি মোকাবিলায় একটি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে বলে বার্তা সংস্থা এপি এবং আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে। এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে দেশগুলো একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করে। নতুন এই চুক্তির অধীনে ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন, যুক্তরাজ্য এবং ইউক্রেন সম্মিলিতভাবে ইউরোপের আকাশসীমা সুরক্ষায় নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলবে। ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। এই প্রকল্পটিকে একটি বিশুদ্ধ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে যা মূলত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্রমাগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে ইউরোপ জুড়ে এক ধরণের চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি শীতকাল শুরু হওয়ার আগেই তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার তাগিদ নিয়ে প্যারিস সফরে আসেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি দামি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপীয় অঞ্চলে নিজস্ব প্রযুক্তিতে সস্তা ও কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই জোটের অন্যতম লক্ষ্য। ইউক্রেন ইতিমধ্যে তাদের নিজস্ব ফ্রেয়া নামক একটি সাশ্রয়ী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ শুরু করেছে যা এই জোটের মাধ্যমে বিশেষ গতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই উদ্যোগটি ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো সম্মিলিতভাবে গবেষণা, প্রযুক্তি বিনিময় এবং সামরিক সক্ষমতার সমন্বয় ঘটিয়ে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। তবে এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা सदस्यों তালিকায় পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড বা বাল্টিক দেশগুলোর মতো রাশিয়ার নিকটবর্তী অঞ্চলের দেশগুলোর অনুপস্থিতি অনেকের মনে বিস্ময় তৈরি করেছে। একই সাথে বিশ্ব পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও এই জোটের বাইরে রাখা হয়েছে যা ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন গড়ে তোলার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে স্পষ্ট করে। গত জুন মাসে ফরাসি এবং জার্মান যৌথ যুদ্ধবিমান তৈরির একটি বড় প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়ার পর এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র জোট ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক ঐক্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন যে এই সিদ্ধান্ত কেবল ইউক্রেনকে রক্ষা করবে না, বরং সামগ্রিকভাবে ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তাকে সুসংহত করবে।
যা কম স্পষ্ট তা হলো এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আসলে কত দ্রুত মাঠ পর্যায়ে কার্যকর রূপ নিতে পারবে এবং এতে মোট কি পরিমাণ ব্যয়ের প্রয়োজন হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের অধীনে ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স দেওয়ার একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত দেওয়া হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন তা বাস্তবায়ন হতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। এই শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ইইউর ৯০ বিলিয়ন ইউরোর একটি বড় ঋণ সহায়তায় যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে নতুন অস্ত্র সরবরাহে সাহায্য করবে। এই ঋণ সহায়তার প্রথম কিস্তির ৬ বিলিয়ন ইউরো সরাসরি ড্রোন উৎপাদনে ব্যয় করা হবে বলে ইইউ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করে একে যুদ্ধবাজ এবং বিভ্রান্তদের জোট বলে অভিহিত করেছেন। তবে ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার এই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ও ক্রমাগত হুমকিকে উপেক্ষা করে তাদের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র জোট ও যৌথ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত সচল করার লক্ষ্যে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
