মরোক্কো বংশোদ্ভূত মার্কিন ফুটবল রেফারি ইসমাইল এলফাত আগামী বুধবার আটলান্টা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা বিশ্বকাপের ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা সেমিফাইনাল ম্যাচটি পরিচালনা করবেন বলে ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা নিশ্চিত করেছে, আল জাজিরা ও গোল ডটকম জানিয়েছে। চলতি টুর্নামেন্টে ৪৪ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ কর্মকর্তার এটি চতুর্থ ম্যাচ হতে যাচ্ছে। এর আগে তিনি গ্রুপ পর্বে জাপান ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যকার ২-২ ব্যবধানের ড্র এবং উরুগুয়ের বিপক্ষে স্পেনের ১-০ গোলের জয়ের ম্যাচটি পরিচালনা করেছিলেন। এ ছাড়া নকআউট পর্বে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে নরওয়ের ২-১ গোলের অবিস্মরণীয় জয়ের হাই-প্রোফাইল ম্যাচটিতেও তিনি প্রধান রেফারির দায়িত্বে ছিলেন। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য এই মহাকাব্যিক লড়াইয়ে তাকে সহায়তা করবেন মার্কিন সহকারী রেফারি কোরি পার্কার এবং কাইল অ্যাটকিন্স, আর ইতালির মাউরিজিও মারিয়ানি চতুর্থ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন।
মরোক্কোর ঐতিহাসিক ক্যাসাব্লাঙ্কা শহরে জন্মগ্রহণ করা ইসমাইল এলফাত ২০০১ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বৈচিত্র্যময় ভিসা কর্মসূচির অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। পরবর্তীতে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং বর্তমানে টেক্সাসের অস্টিনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। রেফারি হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল বেশ আকস্মিকভাবে কারণ তিনি প্রথমে একজন অপেশাদার ফুটবলার ছিলেন। স্থানীয় লীগ দল অস্টিন লাইটনিংয়ের স্ট্রাইকার হিসেবে খেলার সময় মাঠের কিছু দুর্বল রেফারির সিদ্ধান্তের কারণে তিনি নিজেই বাঁশি হাতে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং একটি রেফারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হন। প্রথম দিকে তিনি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে পূর্ণকালীন বিক্রয়কর্মী হিসেবে চাকরি করার পাশাপাশি বিভিন্ন যুব লীগ ও হাই স্কুলের ম্যাচে পার্ট-টাইম রেফারি হিসেবে কাজ চালিয়ে যান।
আমেরিকার ফুটবলে দ্রুত উন্নতি করে তিনি ২০১১ সালে দেশের শীর্ষ লীগ মেজর লীগ সকার বা এমএলএস-এ চতুর্থ কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন এবং ২০১২ সালে প্রধান রেফারি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর ২০১৬ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ফিফা আন্তর্জাতিক রেফারি হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। একই বছর নিউ ইয়র্ক রেড বুলস টু এবং অরল্যান্ডো সিটি বি-এর মধ্যকার একটি ম্যাচে তিনি বিশ্বব্যাপী প্রথম মাঠ পর্যায়ের ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর রিভিউ পরিচালনা করে ইতিহাসের অংশ হয়ে যান। গত ১৪ বছর ধরে আমেরিকান লীগে রেফারিংয়ের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি তিনি ২০২০ এবং ২০২২ সালে দুইবার লীগের সেরা রেফারি নির্বাচিত হন। গম্ভীর ও নিখুঁত ম্যাচ পরিচালনার জন্য তিনি দ্রুতই আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে নিজের অবস্থান শক্ত করতে সক্ষম হন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিক এবং ২০২১ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে ম্যাচ পরিচালনার পর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের মাধ্যমে তার জ্যেষ্ঠ বিশ্বমঞ্চে অভিষেক ঘটে। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে যেখানে আর্জেন্টিনা পেনাল্টি শুটআউটে ফ্রান্সকে পরাজিত করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল সেখানে তিনি সফলভাবে চতুর্থ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই সময় তিনি নিজেকে একজন অভিবাসী, আফ্রিকান বংশোদ্ভূত এবং মুসলিম হিসেবে তিন স্তরের সংখ্যালঘু হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন যা আমেরিকান ফুটবল কর্মকর্তাদের জন্য এক অনন্য নজির স্থাপন করে। গত বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের স্ট্রাইকার ভিনসেন্ট আবুবকরের গোল উদযাপনের পর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেওয়ার সময় তার মুখে হাসিমুখে হাত মেলানোর মানবিক ভঙ্গিটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল।
যা কম স্পষ্ট তা হলো আগামী বুধবারে ফুটবল বিশ্বের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তির মধ্যকার এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে খেলোয়াড়দের চরম উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রেফারি মাঠের সিদ্ধান্তগুলোতে কতটা কঠোরতা বজায় রাখবেন। ফুটবল বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে লিওনেল মেসির দলের জন্য পাঁচটি ম্যাচে শতভাগ জয়ের রেকর্ড থাকা এই রেফারি এক ধরণের সৌভাগ্যের প্রতীক হলেও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে হাই-স্টেক ম্যাচে তার ওপর তীব্র চাপ থাকবে। গুরুতর হাঁটুর ইনজুরি কাটিয়ে দুটি অস্ত্রোপচারের পর প্রায় ১৩ মাস মাঠের বাইরে থেকে অবসরের কাছাকাছি চলে যাওয়া এই কর্মকর্তার জন্য এই ম্যাচটি এক অনন্য পুনরুত্থান। ফিফার কঠোর নিয়ম অনুযায়ী এই নিয়োগের ফলে স্প্যানিশ বা আর্জেন্টাইন রেফারিদের ফাইনাল ম্যাচ পরিচালনার ভাগ্যও নির্ধারিত হয়ে গেছে।
