মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বৈঠক করেছেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই নেতা অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং তেল রপ্তানি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে ইরাকের এই সফরের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ইরাককে সতর্ক করেছেন যেন তারা ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দ্রুত নিরস্ত্রীকরণের আওতায় নিয়ে আসে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের এই সময়ে ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক জটিলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
ইরাক এখন একটি কঠিন ভূ-রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দেশটির সরকার একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক উপেক্ষা করাও তাদের পক্ষে অসম্ভব। ইরাকের অর্থনীতি আধুনিকায়নের জন্য মার্কিন প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে ইরাকের শিয়া জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের সঙ্গে ইরানের গভীর আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। এই দ্বিমুখী সম্পর্কের কারণে ইরাককে অত্যন্ত কৌশলী অবস্থানে থাকতে হচ্ছে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি ওয়াশিংটন সফরের সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণের আলোচনা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। ট্রাম্প তাকে একজন উদ্যমী ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে ব্যাপক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এই অর্থনৈতিক সাহায্যের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাক থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হবে এবং একই সময়ে ইরাককে সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে।
হেগসেথের সঙ্গে বৈঠকের পর মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে ইরাকের ওপর চাপ প্রয়োগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তারা সরাসরি ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে আক্রমণকারী হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে বাস্তবতা হলো, ইরাকের নিরাপত্তা কাঠামোয় ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। কাতাইব হিজবুল্লাহর মতো শক্তিশালী সংগঠনগুলো খোলাখুলি ঘোষণা করেছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা প্রতিরোধে অংশ নেবে। এই ধরনের অবস্থান ইরাকি সরকারের জন্য চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইননা রুডলফ মনে করেন, বাগদাদ ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে আগ্রহী হলেও তারা ইরানকে পাশ কাটিয়ে কিছু করতে পারবে না। ইরাক কখনোই তার ভূখণ্ডকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার লঞ্চপ্যাড হিসেবে ব্যবহার করতে দেবে না। এটি ইরাকের সার্বভৌমত্বের জন্য যেমন হুমকি, তেমনি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও বিপর্যয়কর।
বর্তমানে ইরাকের রাজনীতি অভ্যন্তরীণভাবেই বিভাজিত। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা যদি আরও বৃদ্ধি পায়, তবে ইরাকের বর্তমান জোট সরকার ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংঘাত তীব্র হলে ইরাক কেবল মধ্যস্থতাকারী হিসেবেই নয়, বরং পরোক্ষ যুদ্ধের ময়দান হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। রুডলফের মতে, এই সংকটের বড় বিপদ হলো বিচ্ছিন্ন কোনো যুদ্ধ নয়, বরং হাজারো ছোট ছোট সংঘাত যা ধীরে ধীরে ইরাকের সার্বভৌমত্বকে নড়বড়ে করে দেবে। ইরাকি নেতৃত্বকে এখন তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় এই ভারসাম্য বজায় রাখার কাজটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে।
