স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতা সীমান্তে সাম্প্রতিক গণপ্রবেশের ঘটনা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ বৈঠককে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বেশ কিছু ইউরোপীয় নেতার তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন বলে আল জাজিরা ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে। গত সপ্তাহে ঘটা এই ঘটনার ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার সংগঠনগুলো কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে এই সংকটকে অভিবাসনবিরোধী প্রচারণা হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছে।
গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ষাটেরও বেশি হাজার মানুষ এই উত্তর আফ্রিকান ছিটমহলে প্রবেশ করলে সেখানে একটি গুরুতর মানবিক জরুরি অবস্থা তৈরি হয়, যা সামাল দিতে স্পেনকে অতিরিক্ত সামরিক ও পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করতে হয়েছিল। স্প্যানিশ ও মরক্কীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই পারাপারের চেষ্টার সময় নৌকাডুবি ও হুড়োহুড়িতে আংশিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তবে প্রবেশকারীদের সিংহভাগই পরবর্তীতে মরক্কোতে ফিরে গেছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মার্লাসকা নিশ্চিত করেছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিলের বর্তমান সভাপতি দেশ আয়ারল্যান্ডের উদ্যোগে আয়োজিত এই জরুরি ভিডিও বৈঠকে ব্লকের ছাব্বিশটি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে বাইশটি দেশ সমন্বিত পদক্ষেপ ও বাইরের সীমানা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে। সেউতার এই ঘটনা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অভিবাসন নীতি নিয়ে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের বিভাজনকে আবার স্পষ্ট করে তুলেছে। কিছু সরকার কঠোর মনোভাব গ্রহণের পক্ষে জোরালো সওয়াল করলেও অন্যপক্ষ আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলার ওপর জোর দিচ্ছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি প্রধানমন্ত্রী সানচেজের অন্যতম কড়া সমালোচক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন এবং মাদ্রিদের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্পেনের সাথে সাময়িক বিমান ও সমুদ্র সীমানা নিয়ন্ত্রণ আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। সানচেজ এই সমালোচনা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে জানান যে ইতালির এই অবস্থান ইউরোপীয় আইন, মানবিক আইন এবং পারস্পরিক সংহতির নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে একান্ন সালের পর থেকে ইতালি স্পেনের তুলনায় অনেক বেশি অভিবাসী গ্রহণ করেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে সামগ্রিকভাবে অনিয়মিত অভিবাসনের হার কমলেও সেউতার এই ঘটনা রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সীমান্ত এজেন্সি ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী অতীতে অভিবাসনের হার অনেক বেশি থাকলেও চলতি বছরের প্রথম অর্ধেকাংশে তা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। তা সত্ত্বেও কড়াকড়ি আইন ও আশ্রয় প্রার্থীদের নিয়ে বিতর্ক থামেনি এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলো অফশোর ডিটেনশন সেন্টারে দীর্ঘমেয়াদি আটকে রাখার নীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
স্প্যানিশ সরকার এই সংকটের সঠিক ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে যে মরক্কোর সাথে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমেই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। দেশটির শীর্ষ আদালতের একটি সাম্প্রতিক রায়ের ভুল ব্যাখ্যা মানব পাচারকারীদের পক্ষ থেকে ছড়ানো হয়েছিল বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। মরক্কোর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান যে আদালতের রায় সংক্রান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারের প্রভাব সম্পর্কে তারা আগেই স্পেনকে সতর্ক করেছিলেন এবং এককভাবে মরক্কোর ওপর দোষ চাপানো বাস্তবসম্মত নয়।
