শুক্রবার, ০৭ আগস্ট, ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

ফোনের লোকেশন ডেটা কি পুলিশের হাতের মোয়া? সুপ্রিম কোর্টে চতুর্থ সংশোধনীর পরীক্ষা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ১১:৩৭ পিএম

ফোনের লোকেশন ডেটা কি পুলিশের হাতের মোয়া? সুপ্রিম কোর্টে চতুর্থ সংশোধনীর পরীক্ষা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বর্তমানে একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছে যেখানে পুলিশের তদন্ত করার ক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের ডিজিটাল গোপনীয়তার অধিকার পরস্পরবিরোধী অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। সোমবার দেশটির সর্বোচ্চ আদালত ‘জিওফেন্স ওয়ারেন্ট’ নামক একটি বিশেষ ব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে শুনানি করেছে। 

এই প্রক্রিয়ায় পুলিশ কোনো অপরাধের তদন্তে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার নির্দিষ্ট সময়ে থাকা সব মানুষের ফোনের লোকেশন ডেটা বা অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য দেওয়ার জন্য গুগলের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্য করতে পারে। বিচারকরা এখন খতিয়ে দেখছেন যে এই ধরনের ঢালাও নজরদারি মার্কিন সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর পরিপন্থী কি না যা মূলত নাগরিকদের অযৌক্তিক তল্লাশি থেকে সুরক্ষা দেয়।

এই বিতর্কের মূলে রয়েছে ভার্জিনিয়ার একটি ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা। ২০১৯ সালে সেখানে একটি ব্যাংক ডাকাতি হওয়ার পর পুলিশ কোনো সন্দেহভাজনকে খুঁজে পাচ্ছিল না। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় যে ডাকাতটি ফোনের ব্যবহার করছিল। এর পর পুলিশ গুগলের কাছে একটি ওয়ারেন্ট নিয়ে যায় যাতে ওই ব্যাংকের ৩০০ মিটারের মধ্যে থাকা কয়েক লাখ মানুষের অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য চাওয়া হয়। 

এই তথ্যের সূত্র ধরে পুলিশ ওকেল্লো চ্যাট্রি নামক এক যুবককে শনাক্ত করে এবং পরবর্তীতে তার বাড়ি থেকে ডাকাতি হওয়া অর্থ ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে। চ্যাট্রিকে ১১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও তার আইনজীবীরা এই তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে অসাংবিধানিক বলে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাদের দাবি পুলিশ কোনো সুনির্দিষ্ট সন্দেহভাজন ছাড়াই হাজার হাজার নির্দোষ মানুষের ব্যক্তিগত জীবন পর্যালোচনা করেছে যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস এই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন যে সরকার যদি এই ক্ষমতা পায় তবে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন বা গির্জায় কারা উপস্থিত ছিলেন তা বের করার ক্ষেত্রে পুলিশকে কে থামাবে। রবার্টসের মতে এটি ভবিষ্যতে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নজরদারির একটি হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। 

অন্যদিকে বিচারক নীল গোরসাখও সরকারি ক্ষমতার এই ব্যাপক প্রসারের সমালোচনা করেছেন। তবে রক্ষণশীল বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি মনে করেন গুগল ইতিমধ্যেই তাদের লোকেশন হিস্ট্রি ফিচার পরিবর্তন করেছে যার ফলে এখন পুলিশের পক্ষে এই ডেটা পাওয়া আগের চেয়ে কঠিন। তাই এই মামলার প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।

চ্যাট্রির আইনজীবীদের যুক্তি হলো ২০১৮ সালের সুপ্রিম কোর্টের একটি পূর্ববর্তী রায় যেখানে বলা হয়েছিল যে ফোনের টাওয়ার ডেটা নিতে হলে পুলিশের পরোয়ানা লাগবে। তাদের মতে যদি টাওয়ারের তথ্যের জন্য পরোয়ানা লাগে তবে গুগলের নিখুঁত লোকেশন ডেটার জন্য আরও কঠোর নিয়ম থাকা উচিত। গুগলের এই ডেটা একজন মানুষের অবস্থান মাত্র তিন মিটারের ব্যবধানে এবং প্রতি দুই মিনিটে একবার শনাক্ত করতে সক্ষম। 

আইনজীবীরা একে ব্রিটিশ আমলের সেই ‘জেনারেল ওয়ারেন্ট’ বা ঢালাও পরোয়ানার সাথে তুলনা করেছেন যার মাধ্যমে পুলিশ যাকে খুশি তল্লাশি করতে পারত। আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা এই প্রথার বিরুদ্ধেই সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী এনেছিলেন।

মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে সলিসিটর জেনারেল ডি জন সাউয়ার যুক্তি দিয়েছেন যে চ্যাট্রি নিজেই স্বেচ্ছায় তার লোকেশন হিস্ট্রি চালু রেখেছিলেন। তার মতে যখন একজন মানুষ স্বেচ্ছায় কোনো কোম্পানির কাছে তার ডেটা শেয়ার করে তখন পুলিশ সেই তথ্য চাইলে তাকে আর গোপন তল্লাশি বলা যায় না। প্রসিকিউশনের দাবি অপরাধীদের ধরতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। 

তবে ডেটা প্রাইভেসির বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে আধুনিক স্মার্টফোনের যুগে লোকেশন ডেটা বন্ধ করে চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনে আমেরিকার পুলিশ কতটা স্বাধীনতা পাবে এবং সাধারণ মানুষের পকেটে থাকা স্মার্টফোনটি কি শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দেবে কি না।

banner
Link copied!